ফ্রি লেকচারশিট এবং ফ্রি রিসোর্স

৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১২শ শ্রেণি

ফ্রি কোর্সসমূহ

৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১২শ শ্রেণি

shikha-sofor-rochona

শিক্ষাসফরের গুরুত্ব 

ভূমিকা :

‘বিপুল এ পৃথিবীর কতটুকু জানি
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী-
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী-গিরি, সিন্ধু-মুরু,
কত-না অজানা জীব কত-না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে।’ – ঐকতান
                                  –রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। প্রতিনিয়ত মানুষ নিত্য নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে চায়। এজন্য বলা হয় জানার কোনো শেষ নেই। স্বয়ং কবিগুরু এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। মানুষ নানা উপায়ে কোনো জায়গা কিংবা কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে। যেমন–বই পড়ে, সংবাদপত্র পড়ে, টেলিভিশনে মাধ্যমে অথবা লোকমুখে শুনে। তবে নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ নিজস্ব। অনুভূতি নিজস্ব, রূপে ধরা দেয়। এক্ষেত্রে শিক্ষাসফরের গুরুত্ব অতুলনীয়। কেননা এর মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন সহ বিনোদন লাভ করা যায়।

শিক্ষাসফর কী : শিক্ষাসফর হলো একটি পরিকল্পিত ভ্রমণ, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে  নানা জ্ঞান অর্জন ও অভিজ্ঞতা লাভ করে। এটি সাধারণত কোনো ঐতিহাসিক স্থান, জাদুঘর, বিজ্ঞান কেন্দ্র প্রকৃত বা শিল্প-সংস্কৃতির সম্পূর্ণ জায়গায় আয়োজিত হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যবিষয়ক জ্ঞান বাস্তবে দেখতে পারে এবং বুঝতেও পারে। 

শিক্ষার উপায় শিক্ষাসফর ও ইতিহাস : শিক্ষা অর্জনের অন্যতম একটি উপায় হলো শিক্ষাসফর। মূলত এর মাধ্যমে খুব সহজে কোনো স্থান, পরিবেশ, মানুষ, সংস্কৃতি বা প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য লাভ করা যায়। কোনো কিছু দূর থেকে দেখা বা জানার চেয়ে  বাস্তবে নিজের চোখে দেখার মজাই সম্পূর্ণ আলাদা। জানা যায় অতীতে মানুষ শিক্ষা লাভের আশায় দেশ দেশান্তরে ঘুরে-বেরিয়েছে। কারণ তখনকার সময় বই সহজলভ্য ছিল না। তারা নিজ চোখে সবকিছু দেখে নানা জ্ঞান, অভিজ্ঞতা অর্জন করত। অতীতে যারা শিক্ষা লাভের জন্য দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করেছেন, যারা তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন – হিউয়েন সাউ, ইবনে বতুতা, ফা–হিয়েন, ক্যাপ্টেন কুক প্রমুখ মনীষীরা। তারা প্রতিনিয়ত নানা স্থানে পরিভ্রমণ করেছেন দুঃসাহসিকতার সাথে। 

শিক্ষাসফরের গুরুত্ব : শিক্ষার জন্য শিক্ষা সফরের গুরুত্ব অশেষ। কেননা প্রাচীনকালে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কোনো রীতি ছিল না। তবে সাহিত্য নির্ভর কিছু কিছু গ্রন্থ রচনার রীতি ছিল। ফলে কোনো জায়গা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব মনে হতো। এতে মানুষের মাঝে অন্য দেশ, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সম্পর্কে ধারণা লাভ করার কৌতুহল জাগ্রত হয়। এ থেকে মানুষ এই জানার আগ্রহে বেরিয়ে পড়ে ভ্রমণে। তারা ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভ্রমণের মাধ্যমে সেই দেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে থাকে। যা পরবর্তী সময়ে বইয়ের লিপিবদ্ধ করে মানুষের কৌতুহল উদ্রেগ নিবারণ করে। এতে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে সাহিত্যজগৎ তেমনি মিটেছে মানুষের জ্ঞানতৃষ্ণা। 

শিক্ষাসফরের উদ্দেশ্য : প্রত্যেকটি বিষয়ের কোনো না কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। শিক্ষা সফরেরও উদ্দেশ্য যথার্থ উদ্দেশ্য রয়েছে। আর তা হলো নতুন কিছুকে জানার ইচ্ছা বা আগ্রহ পূরণ। এর মাধ্যমে মানুষ তার অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার যে ইচ্ছা তা পূরণ করে থাকে। এ বিষয়ে যথার্থ বলা যায়– ভ্রমণ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্য জানতে সাহায্য করে। যা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সৃষ্টিকর্তা এ পৃথিবীর মাঝে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য রহস্যময় বস্তু। যা সম্পর্কে কখনোই পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। তবে মানুষ সর্বদা তা নিয়ে কাজ করে চলছে। অজানাকে জানা আর অদেখাকে দেখার কৌতুহলে মানুষ ছুটে চলছে আকাশ-পাতাল। এর মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণ। এরূপ মহৎ উদ্দেশ্যই শিক্ষা সফরের মূল অনুপ্রেরণা।

শিক্ষাসফর ও শিক্ষা : ব্যক্তিজীবন ও শিক্ষাজীবন দুটি ক্ষেত্রেই শিক্ষাসফরের অতি গুরুত্ব রয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য যেহেতু শিক্ষা দেওয়া। প্রত্যেক মানুষের উচিত ভ্রমণের সময় শিক্ষনীয় বিষয়গুলো উপলব্ধি করা। এতে করে যেমন ব্যক্তি জীবনের জ্ঞানতৃষ্ণা ও বিনোদনতৃষ্ণা সম্ভব অপরূপভাবে জাতীয় জীবনকেও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তাই অন্তত শিক্ষার জন্য হলেও শিক্ষা সফরে বা ভ্রমণে বের হওয়া অপরিহার্য। 

বাস্তবধর্মী শিক্ষা লাভ : মানুষ বই পড়ে, টিভি দেখে, সংবাদপত্র পড়ে, অথবা লোক মুখে শুনে কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে। তবে নিজ চোখে দেখার অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা মানুষের কৌতুহল উদ্রেগ নিবারণের সহায়ক। কেননা ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষ কোনো জায়গা, পরিবেশ, সমাজ, রাষ্ট্র অথবা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে বাস্তবধর্মী অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। পরিচিত হতে পারে ভিন্ন পরিবেশ ও ভিন্ন মানুষের সাথে। তাই বাস্তবধর্মী জ্ঞান লাভের জন্য শিক্ষাসফর শিক্ষার সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা।  

বিনোদনের উপায় হিসাবে শিক্ষাসফর : জীবনে চলার পথে মানুষ একঘেয়েমির শিকার হয় প্রায়ই। এজন্য প্রয়োজন বিনোদনের। বিভিন্ন উপায়ে বিনোদন লাভ করে সেই একঘেয়েমি দূর করে থাকে মানুষ। তবে এক্ষেত্রে বিনোদন হিসেবে কোনো সফর বা ভ্রমণকে বেছে নিলে উপকারটা আরো গভীর হয়। কেননা এর মাধ্যমে বিনোদনের সাহায্যে শিক্ষাও লাভ করা যায় অতি সহজে। তবে এক্ষেত্রে একটু সচেতন থাকা উচিত। আনন্দস্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে না দিয়ে জ্ঞান অর্জনের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। তবেই বিনোদনের পাশাপাশি সহজেও শিক্ষা লাভ করা সম্ভব হবে। 

শিক্ষাসফরে স্থান নির্বাচন : যেকোনো বিষয়ে নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। শিক্ষাসফরের ক্ষেত্রেও তাই। শিক্ষাসফরের জন্য সর্বদা শিক্ষণীয় স্থান নির্বাচন করা জরুরী। কেননা এর মূল উদ্দেশ্য আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করা। তাই স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে আধুনিকতার স্পর্শ প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ, কৌতুহল নিবারক, সমৃদ্ধ, রহস্যময় স্থান, উদ্রেগ সৃষ্টিকারী প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যমণ্ডিত স্থান নির্বাচন করা উচিত। এতে শিক্ষাসফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হবে। 

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাসফরের জন্য উপযুক্ত স্থান : চিরসবুজ এই বাংলাকে কেউ বলেছেন স্বর্গের দরজা, আবার কেউ বলেছেন সোনার বাংলা। সত্যি এ দেশের প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যে কোন মানুষকে বিমোহিত করার মতো। ময়নামতির বৌদ্ধ বিহার আমাদের বৌদ্ধ সভ্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত (১৫৫ কি.মি) কক্সবাজারে অবস্থিত হিমছড়ির শীতল পানির ঝর্ণা, সবুজে ঘেরা মাধবকুণ্ডের দীর্ঘ জলপ্রপাত আমাদের তথা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সিলেটের মনমুগ্ধকর চা বাগান, জাফলং-এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ্য। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য সকলকে আকৃষ্ট করে। পাহাড়পুর, রাঙ্গামাটি, দিনাজপুরের সাগরদীঘি প্রাচীন সভ্যতার ও সৌন্দর্যের  রাজসাক্ষী। সোনারগাঁয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের লোক শিল্প জাদুঘর, পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন ও এর রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিতাবাঘ হরিণ প্রভৃতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বাংলাদেশের একদিকে সুউচ্চ পাহাড়, অপরদিকে বিশাল জলরাশি, যা সহজে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। ঢাকার আহসান মঞ্জিল একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। 

একটি শিক্ষাসফরের বর্ণনা : আমাদের স্কুলের ক্লাস নিয়মিত চলছে। গত বৃহস্পতিবার স্কুল থেকে আমরা গেলাম কুমিল্লার শালবন বিহার। মূলত এটি ছিল শিক্ষাসফর। আমাদের সঙ্গে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও চারজন শিক্ষক ছিলেন। 

শালবন বিহার এ যখন পৌছালাম তখন বাজে সকাল নয়টা। মেঘলা আকাশ আর মৃদু ঠান্ডা বাতাস, মনটা জুড়িয়ে দিলো। সূর্য মেঘের আড়াল থেকেই মাঝে মাঝে রোদ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে। বৌদ্ধ বিহার বৌদ্ধদের সাধনার স্থান। একসময় এখানে বিরাজ করেছে প্রাণচাঞ্চল্যর পরিবেশ, আর বর্তমান রয়েছে শুধু এর স্মৃতি। চোখের সামনে দেখলাম ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধসাধকদের। ১১৫ টি কক্ষে সাধন করছেন তারা, অতীতে হারিয়ে গিয়েই আমি তা দেখতে পাচ্ছি। যেন মনে হচ্ছিল আমি হাজার বছরের পুরনো। হঠাৎ ফিরে এলাম বর্তমানে। এগুলো তো আজ কেবলই অতীতের সাক্ষী হয়ে আছে। এ ছড়ানো ছিটানো ধ্বংসস্তূপ ছিল প্রাচীন দেব রাজবংশের গড়ে তোলা এক সভ্যতা। বিহারের সাথে জাদুঘরটি। ধ্বংসস্তূপ থেকে সংগৃহীত সবই এ জাদুঘরে সংরক্ষিত। জাদুঘরের সমস্ত নিদর্শন যখন ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম তখন শুধু মনে হচ্ছিল, আজ তারা নেই। আছে শুধু তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বাসস্থান; তারা তো একসময় এ পৃথিবীতে ছিল। আমরা আজ আছি, কিন্তু এক সময় আমরা হারিয়ে যাব মহাকালের স্রোতে। কথাটি চিন্তা করতে শরীর শিউরে উঠলো। সারাদিন বিহারে সময় কাটিয়ে ফিরলাম সন্ধ্যাবেলায়। পথে আমর চোখে ভাসছিল পুরো বিহার। এটি সত্যি একে দারুন ঐতিহাসিক স্থান। 

বিদেশী শিক্ষাসফর : শিক্ষাসফরের জন্য ধরা বাধা কোনো সীমানা নেই। তবে বাজেটের ওপর নির্ভর  করে মানুষ শিক্ষা সফরের জন্য জায়গা নির্ধারণ করতে পারে। দেশের বাইরে ও শিক্ষাসফরে যাওয়া যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে স্থান নির্বাচনে অবশ্যই সচেতন হবে। ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা বিনোদন লাভের আশায় এমন স্থান বিবেচনা করা যেতে পারে। এরূপ স্থানের মধ্যে রয়েছে-ভারতে আগ্রার তাজমহল রাজস্থানের প্রাচীন নিদর্শন, কাশ্মীর, নেপাল, প্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত মিনার, চীনের মহাপ্রাচীর, ব্যাবিলনের, শূন্য উদ্যানসহ পৃথিবীর নানা চমক প্রদর্শনীয় স্থানসমূহ। 

উপকারিতা : প্রত্যেকটি বিষয়ের উপকার ও অপকার দিক থাকে। তবে শিক্ষাসফরের ক্ষেত্রে এর উপকার দিক বেশি। এর মাধ্যমে অজানাকে যেমন জানা যায় তেমনি দেখাও যায়। জ্ঞান-তৃষ্ণা নিবারণের পাশাপাশি অন্যের কৌতূহল পূরণে সহায়ক শিক্ষা যায়। তাই বছরে অন্তত একবারের জন্য হলেও শিক্ষা সফরে যাওয়া উচিত। এতে আমাদের বাস্তবময় জীবনে কিছুটা হলেও উপভোগ্য সময় কাটবে। 

উপসংহার : ব্যক্তিজীবন ও শিক্ষাজীবনে শিক্ষার সকলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেননা শিক্ষাসফর বাস্তবধর্মী শিক্ষা প্রদান ও বিনোদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই জ্ঞান ভান্ডারকে পরিপূর্ণ করার জন্য শিক্ষাজীবনে শিক্ষাসফরে দিকে মনোযোগ দেওয়া সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

Shikha Sofor Rochona PDF
শিক্ষাসফরের গুরুত্ব রচনা PDF

অন্যান্য রচনা
একটি নির্জন দুপুর
নিবিড় অরণ্যে একাকী
বাংলাদেশের সামাজিক উৎসব