ফ্রি লেকচারশিট এবং ফ্রি রিসোর্স

৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১২শ শ্রেণি

ফ্রি কোর্সসমূহ

৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১২শ শ্রেণি

bijoy dibosh rochona

বিজয় দিবস 

ভূমিকা : বিজয় দিবস বাংলাদেশের মানুষের কাছে আনন্দ বেদনায় মিশ্রিত একটি স্মরণীয় দিন। বাঙালি জাতির স্মৃতি বিচরিত এই মহান দিনটিতে প্রত্যক্ষ করেছে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয়কে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি সার্বভৌম দেখ হিসেবে। এ বিজয়ের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে জাতীয় জীবনের একটি নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ নানা দেশের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্জন করতে শুরু করে। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ মর্যাদা লাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে। 

বিজয় দিবসের ঐতিহাসিক পটভূমি : বাংলাদেশের বিজয় দিবসের পটভূমিতে ফুটে উঠেছে বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের এক সংগ্রামী অধ্যায়, রয়েছে পাকিস্তানের জঙ্গিশাহীর শাসন-শোষণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে অগ্নিশপথময় আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। সে ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য মাইলফলক মহান ভাষা আন্দোলন। পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এ আন্দোলনের মাধ্যমে উন্মেষ ঘটেছিল বাঙালি ভাষাবিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার। 

এ চেতনার ধারাই ক্রমোবিকশিত হয়েছে ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-র ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এ সমস্ত আন্দোলনের মুখে ঘটে যায় ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। স্বাধিকার চেতনা ধীরে ধীরে রূপ নিতে থাকে জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনে। পাকিস্তানি সামরিক জঙ্গিশাহীর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে ফুঁসে উঠেছিল বাঙালি জাতি। স্বদেশমন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চক্রের ধর্মান্ধতার বেড়াজাল, অগ্নিশপথ নিয়েছিল স্বাধিকার অর্জনের আশায় তা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল দু শতকের দুঃশাসনের কেল্লাকে। সামরিক জান্তা বাধ্য হয়ে নির্বাচন দিলে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতি স্বাধিকারের পক্ষে রায় দেন এবং আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭১-এর মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে স্বাধিকার আন্দোলন চরম শক্তি লাভ করে। কিন্তু বাঙালির স্বাধীন চেতনাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ৭১-এর ২৫ শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জল্লাদ ইয়াহিয়ার লেলিয়ে দেওয়া বাহিনী আক্রমণ চালিয়েছিল এদেশের নিরীহ মানুষদের ওপর। জল্লাদ বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় কোটি কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ৭১-এর দিনগুলোতে কেবল বিপর্যয়কেই নিয়তি বলে মেনে নেয়নি এদেশের মানুষেরা। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিল হাজার হাজার দেশপ্রেমিক। সমস্ত জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল প্রতিরোধ সংগ্রামে। ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, কুলি, মজুর,হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলকে নিয়ে একসাথে গড়ে উঠেছিল মুক্তিবাহিনী। জল্লাদ বাহিনীর হাত থেকে এদেশকে রক্ষা করার জন্য ব্রতী হয়েছিল এদেশের প্রায় সমস্ত জনগণ। দীর্ঘ নয় মাস ধরে যুদ্ধ করার পর ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি বীর সন্তানেরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। 

বিজয় দিবসের তাৎপর্য : মুক্তিযুদ্ধের বিজয় কেবল শুধুমাত্র একটি জাতীয় পতাকা বা স্বাধীন ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর তাৎপর্য বিরাট এবং সুদূরপ্রসারী। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে অবহেলিত পশ্চাৎপদ শোষিত জাতীয় রচনা করেছিল অসামান্য গৌরবগাঁথা। বিশ্বের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ভিয়েতনামের পরে আরেক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশ। সেই সাথে জাতীয় জীবনে ঘটে গিয়েছিল নবজাগরণ, সৃষ্টি হয়েছিল অযুত সম্ভাবনার মুহূর্ত। স্বাধীনতার চেতনা রূপ পরিগ্রহ করেছিল জাতীয় চার মূলনীতিতে- ১. গণতন্ত্র, ২. জাতীয়তাবাদ, ৩.ধর্মনিরপেক্ষতা, ৪. সমাজতন্ত্রের আদর্শে। 

মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও পরবর্তী বাস্তবতা : শোষনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা লাভের আশায় মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হলেও আমাদের স্বপ্ন সম্ভাবনা বাস্তবের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়েছে। ১৯৭৫-এ সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে এদেশের রাজনৈতিকনপ্রেক্ষাপট, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ হয় পরিত্যক্ত। প্রায় দেড় দশক ধরে নতুন করে সংগ্রাম করতে হয়েছিল গণতন্ত্রের জন্য। আদর্শিকভাবে স্বাধীনতার মূল চেতনার অনেক কিছুই এখন অধরা। গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকরণে এখনও পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ এখনো স্বপ্নমাত্র। জাতীয় জীবনে ঐক্যের বদলে সংঘাত, স্বস্তির বদলে অস্থিরতা, আর শাস্তির বদলে নৈরাজ্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। 

আমাদের প্রত্যাশা : মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের সকলের প্রত্যাশা উন্নত দেশ। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও একুশ শতকে বাংলাদেশ কিছু উন্নতি লাভ করেছে। দেশের অর্ধেকেরও বেশি লোক দারিদ্রসীমার উপরে উঠতে পেরেছে। তাছাড়া উন্নতি হয়েছে যোগাযোগব্যবস্থার। কৃষিক্ষেত্রেও প্রাণের সাড়া জেগেছে। গ্রামীণ নারীসমাজ জাগতে শুরু করেছে। এমনকি বেড়েছে শিক্ষার হার, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কমেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে। 

বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান : বিজয় দিবস পালিত হয় মহাসমরোহে। এদিন ভোরে সাভারে অবস্থানরত জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসটির শুভ সূচনা হয়। এছাড়া বাড়ির ছাদে, দোকান, রাস্তার পাশে, স্কুল-কলেজ সরকারি ভবন, এমনকি রিক্সার হ্যান্ডেলেও শোভা পায় লাল-সবুজের পতাকা। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে নানা রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এদিন ভোরে ঢাকার প্যারেড ময়দানে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে কুচ কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। সরকারি ও বেসরকারিভাবে সারাদেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসবমুখর পরিবেশে বিজয় দিবস পালিত হয়। 

আমাদের করণীয় : বিজয় দিবস আমাদের কাছে যেমন একদিকে আনন্দমুখর তেমনি অপরূপদিকে এটি অনেক বেদনাদায়ক। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের বিনিময়ে এ দিবসটি আমরা পেয়েছি। তাই এ দিনটি শুধু বিজয়ের দিন নয়, এটি আমাদের চেতনার জাগরনের দিন। এদিনে আমাদের প্রথম করণীয় হচ্ছে, দেশ ও জাতিকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয়ে শহীদদের আত্মদানকে সার্থক করে তোলা। তবেই বিজয় দিবসের মহিমা হয়ে উঠবে অর্থবহ। 

উপসংহার : শুভবুদ্ধিকে পথপ্রদর্শক করে আমরা প্রতিকূলতা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করেছিলাম। বিজয় দিবসের মহিমায় উদ্ভাসিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মশাল হিসেবে ধারণ করে, আমাদের এগিয়ে যেতে হবে—হতাশা দূরে ঠেলে, প্রত্যয় ও সাহসে দৃপ্ত পদক্ষেপে। পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ না করে প্রগতি ও পরিবর্তনের ধারায় অগ্রসর হতে পারলে আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা আমাদের জীবনে অর্থবহ হয়ে উঠবে।

Bijoy Dibosh Rochona PDF
বিজয় দিবস  PDF

 

অন্যান্য রচনা
বাংলাদেশের সামাজিক উৎসব
শিক্ষাসফরের গুরুত্ব
নারীশিক্ষা