ভূমিকা : বাংলাদেশ হলো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার দেশ। প্রায় প্রতিবছরই এদেশে কোনো না কোনো দুর্যোগ দেখা দেয়। ফলে, মানুষের জীবন,সম্পদ ও পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও সময় মত পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে এবং বিজ্ঞান তথ্যপ্রযুক্তি, কলা-কৌশল জনসচেতনতা যথাযথ সময় কাজে লাগিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব।
অপরদিকে আবার বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প। তাই আমাদের এই ভূমিকম্পজনিত অধিক ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষার জন্য জাতীয় ভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে হবে, না হলে যেকোনো সময় জাতিকে চরমমূল্য দিতে হবে।
ভূমিকম্প কী: ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর ভেতরের স্তরগুলোতে হঠাৎ প্রচন্ড শক্তি বের হয়ে আসার ফলে ভূমি কেঁপে ওঠে। পৃথিবীর নিচে বিশাল প্লেট থাকে – এগুলো অনেক সময় ধীরে ধীরে সরে যায়। যখন কোনো এক মুহূর্তে সেই চাপ আর ধরে রাখতে পারে না, তখন হঠাৎ ঝাঁকুনি তৈরি হয়। এই ঝাঁকুনি মাটির উপর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর তখনই আমরা মাটিকে কাঁপতে দেখি। সাধারণভাবে বলা যেতে পারে, পৃথিবীর নিচের অংশে লুকানো শক্তি এক সময় ফেটে বের হলে মাটি কেঁপে ওঠে – এটাই ভূমিকম্প।
ভূমিকম্পের কারণ :
ভূমিকম্পের উৎপত্তি তিনটি কারণে হয়ে থাকে।
১। ভূপৃষ্ঠজনিত
২। আগ্নেয়গিরিজনিত
৩। শিলাচ্যুতিজনিত
১। ভূপৃষ্ঠজনিত : ভূপৃষ্ঠ সাধারণত অনেকগুলো বড় বড় প্লেটে ভাগ করা। এই প্লেটগুলো একটি আরেকটি থেকে আলাদা থাকে। কোনো এক সময় এই প্লেটগুলো নড়াচড়া করতে করতে কখনোও একে অপরটিকে ধাক্কা দেয়। এই ধাক্কার সময় ভেতরে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হয়, হঠাৎ সেই চাপ যখন বের হয়, তখনই মাটি কেঁপে ওঠে। এটাই সবচেয়ে সাধারণ ভূমিকম্পের মূল কারণ।
২। আগ্নেয়গিরিজনিত : কখনো কখনো পৃথিবীর ভেতরে আগ্নেয়গিরির নিচে গলিত শিলা বা ম্যাগমা থাকে। যখন এই ম্যাগমা উপরের দিকে উঠে যায়, তখন মাটির নিচে প্রচন্ড চাপ তৈরি হয়। এই চাপ ক্রমাগত এত বেশি বেশি হয়ে যায়, যার ফলে চারপাশের শিলাস্তর নড়াচড়া করতে শুরু করে। এই নড়াচড়ার কারণে মাটিতে যে কম্পন হয়, তাকে আগ্নেয়গিরিজনিত ভূমিকম্প বলে।
৩। শিলাচ্যুতিজনিত : মাটির অনেক নিচে বড় বড় শক্ত পাথরের স্তর থাকে, যেগুলোকে বলা হয় শিলা। এই শিলা গুলোর মধ্যে মাঝে মাঝে প্রচন্ড চাপ জমে যায়। যখন এই চাপগুলো আর ধরে রাখতে পারে না, তখনই হঠাৎ এই শিলা গুলো ভেঙে যায় অথবা সরে যায়। শিলার এই ভাঙ্গা বা সরে যাওয়ার ফলে যে তীব্র কম্পন সৃষ্টি হয়, সেটাই হলো শিলাচ্যুতিজনিত ভূমিকম্প।
বাংলাদেশ ও আশপাশে সংঘটিত ভূমিকম্পসমূহ : বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত,যেখানে পৃথিবীর তিনটি বড় টেকটোনিক প্লেট-একে অপরের সঙ্গে মিশে আছে। ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট ও বার্মা প্লেট। এই প্লেটগুলো এক সময় ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। যখন তারা চাপ তৈরি করে এবং একটি অপরটির সাথে ধাক্কা খায়, তখন এ অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
১। ভারতের ইন্ডিয়ান প্লেটের চাপ : ইন্ডিয়ান প্লেটটি উত্তর দিকে ক্রমাগত ধাক্কা দিতে দিতে হিমালয়কে উঁচু করেছে। এই ধাক্কা এবং চাপ বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এজন্য মাঝে মাঝে ভূগর্ভে চাপ জমে মাটি কেঁপে ওঠে, যেটাকে বলা হয় ভূমিকম্প।
২। মিয়ানমারের দিকে বার্মা প্লেটের নড়াচড়া : বাংলাদেশের পূর্ব দিকের অবস্থিত পাহাড়ি অঞ্চল – চট্টগ্রাম, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম – বার্মা প্লেটের কাছে। এ এলাকায় প্লেট ঘষা, নড়াচড়া করা ও ধাক্কা খাওয়ার কারণে অধিকাংশ কম্পন হয়।
৩। হিমালয় অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশে অনুভূত হয় : নেপাল, ভুটান, উত্তর ভারত এ অঞ্চলগুলোতে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তার প্রভাব বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কারণ হিমালয় অঞ্চল প্রচন্ড ভূমিকম্প প্রবণ।
৪.সিলেট-ত্রিপুরা ফল্ট লাইন : বাংলাদেশের পূর্ব দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফল্ট লাইন লক্ষ্য করা যায়, যাকে বলা হয় সিলেট ত্রিপুরা ফল্টলাইন। এ লাইনটির ভেতরে শিলা ভাঙ্গা বা সরে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে, ফলে সিলেট অঞ্চলে মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
৫. বঙ্গোপসাগরের নিচের ভূস্তরের পরিবর্তন : বঙ্গোপসাগরের তলদেশে নরম ও শক্ত স্তরের নড়াচড়া হয়। গভীর সাগরের এই নড়াচড়ার কারণে হালকা কম্পন অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পে ক্ষতি : ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস নেই। ফলে মানুষ সতর্কতামূলক কোনো পূর্ব প্রস্তুতি নিতে পারে না। এই ভূমিকম্পে বাংলাদেশের অসংখ্য ঘরবাড়ি ধ্বংসে পরিণত হবে । এছাড়া রাস্তাঘাট, বড় বড় গাছ, ব্রিজ ভেঙে পড়বে, মানুষসহ অসংখ্য প্রাণী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে, এমনকি অনেক মানুষ দেওয়ালের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করবে। শুধু তাই নয় জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র ধ্বংস হয়ে পড়বে। যদি কখনো বাংলাদেশে বড় আকারের ভূমিকম্প হয় তবে সারা দেশ একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।
ভূমিকম্পের সময় কি করা উচিত, আর কি করা উচিত নয় : ভূমিকম্পের সময় যা যা করতে হবে তা নিচে উল্লেখ করা হলো :
ভূমিকম্প চলাকালীন সময় যা করণীয় –
১। নিচু হয়ে বসতে হবে
২। টেবিল / বিছানা / ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া।
৩। শক্ত করে ধরে থাকা
৪। জানালা,কাঁচ ফ্যান, আলমারি – এসব থেকে দূরে থাকা।
৫। লিফট ব্যবহার না করা।
কখন বাইরে যেতে হবে : কম্পন থেমে গেলে নিজেকে নিরাপদ মনে হলে তারপর সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামতে হবে। প্রথমে খোলা জায়গায় দাঁড়াতে হবে, বিল্ডিং, দেয়াল, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে থাকতে হবে। আবার ভেতরে না ঢুকাই ভালো যতক্ষণ না অন্যরা নিরাপদ বলে।
যতটা সম্ভব যেগুলো করা থেকে বিরত থাকা :
১। কম্পনের সময় মোটেও দৌড়ানো উচিত নয়।
২। লিফট ব্যবহার না করা।
৩। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিচে না নামা।
৪। খোলা বারান্দায় দাঁড়ানো থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
৫। আতঙ্কিত হয়ে ছাদ, বারান্দা থেকে নিচে লাফিয়ে না পড়া।
ভূমিকম্প হওয়ার আগের প্রস্তুতি : ভূমিকম্পের কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাস নেই, তাই এটি কখন ঘটবে আমরা জানিনা। তাই আগে থেকেই আমাদের সকলের প্রস্তুতি থাকা জরুরী –
১। পরিকল্পনা আগে, ব্যবহার পরে : আমরা কেউই জানি না কখন ভূমিকম্প হবে, তাই জরুরী ব্যাগ আগেই তৈরি করে রাখা জরুরী। ঠিক যেমন আমরা ছাতা রাখি বৃষ্টির জন্য, অথবা ওষুধ রাখি অসুস্থতার জন্য। তেমনি আমাদের সকলের ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে ব্যাগে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা উচিত।
২। ব্যাগে কি কি রাখা উচিত : পানি, শুকনো খাবার, একটি টর্চ লাইট, চার্জার, একটি পাওয়ার ব্যাংক, পরিচয় পত্র – সব একই জায়গায়। ব্যাগ ছোট হলে দ্রুত হাতে নেওয়া যায়। অবশ্যই রাতে ঘুমানোর পাশে অথবা দরজার পাশে রাখুন।
৩। রুটিন বানিয়ে রাখুন : পরিবারের সবাইকে শেখান
১. ড্রপ (Drop) নিচু হয়ে পড়া – দাঁড়িয়ে না থাকা, মাটিতে ঝুঁকে বসে পড়া বা কুঁকড়ে পড়া।
২। কভার (Cover) ঢেকে থাকা – টেবিল, বিছানা বা শক্ত কিছু নিচে ঢুকে পড়া। মাথা ও গলা হাত দিয়ে ঢেকে রাখা। জানালার কাঁচ বা ভারী জিনিস থেকে দূরে থাকা।
৩। হোল্ড (Hold) শক্ত করে ধরে থাকা- আশ্রয় নেওয়া জিনিসটি জোরে ধরে থাকা। কম্পন থেমে যাওয়া পর্যন্ত সেই অবস্থায় থাকা।
৪। মাইন্ডসেট : ছোট্ট প্রস্তুতি থাকলে ভয় অনেকটা কমে যায়, মানসিক প্রস্তুতি – নিরাপদ থাকার অর্ধেক কাজ।
উপসংহার : ছোটখাটো ভূমিকম্প মোকাবেলায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি সতর্কতা অবলম্বন করলে বড় ধরনের ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এ সকল শক্তিশালী ভূমিকম্প মোকাবেলা করতে সকল প্রকার প্রস্তুতি আগে থেকে নিয়ে রাখতে হবে। বাংলাদেশে একাধিক বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এতে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, কিন্তু সামনে যদি বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হয় তাহলে প্রচন্ড ক্ষতির আশঙ্কা মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এজন্য এখনই আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই আমরা এ ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পেতে পারি।