ভূমিকা : দেশ ও মানুষের কল্যাণের জন্য লড়াই-সংগ্রামে নিয়োজিত থেকে আজীবন কাটিয়েছেন, এমনই একজন সংগ্রামী মানুষ ছিলেন মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি সারা জীবন বঞ্চিত-শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। তাই দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে। মুক্তিকামী মানুষের কাছে তিনি ছিলেন একজন কাছের মানুষ, সংগ্রামের অকুতোভয় সঙ্গী। আজও বাংলার মানুষ মাওলানা ভাসানীকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
জন্ম ও পরিচয় : মাওলানা ভাসানী জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলায়। আনুমানিক ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ধানগড়া নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ শরাফত আলী খান, মাতার নাম মোসাম্মৎ মজিরন বিবি। বাবার এক কন্যা ও তিন পুত্রের মধ্যে মাওলানা ভাসানী ছিলেন অন্যতম। সংসারে ধন-সম্পদ তেমন ছিল না। মাওলানা ভাসানীর পিতা নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক ছিলেন। ফলে পরিবারের বিলাসিতা ছিল না।
শৈশবজীবন : মাওলানা ভাসানী ছোটবেলায় খুব দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন। সারা গ্রাম জুড়েই তার দুরন্তপনা সবাই উপভোগ করত। গ্রামের নানা রকম খেলাধুলায় তিনি অভাবনীয় পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। দুরন্তপনার কারণে বন্ধুরা তাঁকে ‘চেকা মিয়া’ বলে ডাকত। লাঠিখেলাতেও তার দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়। গানের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি লেটো গানের দলে নামও লিখিয়েছিলেন একসময়। তার বয়স যখন দুই বছর, তখন পিতাকে হারিয়ে দুঃখের মধ্যে পড়েন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে আশ্রয় দেন তাঁর এক দূরসম্পর্কের চাচা। এখানেই ভাসানীর নতুন জীবন শুরু হয়।
শিক্ষাজীবন : চাচা মাওলানা ভাসানীকে গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন। তিনি কিছুদিন ময়মনসিংহের কলমা গ্রামে লেখাপড়া করলেও সেখানে বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি। এরপর তার পড়াশোনা শুরু হয় ইরাক থেকে আগত পীর সৈয়দ নাসিরউদ্দিন বোগদাদীর কাছে। কিছুদিনের মধ্যেই পীর সাহেব আব্দুল হামিদ খানের মেধা ও মনোযোগের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হন। তিনি হামিদ খানকে পাঠিয়ে দেন ভারতীয় উপমহাদেশের সেরা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেওবন্দ মাদ্রাসায়। সেখানকার শিক্ষাগুরুদের সংস্পর্শে তাঁর ভিতরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মন গড়ে ওঠে। মানুষের কল্যাণে ধর্মের সার্থকতা – এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তিনি ফিরে আসেন।
কর্মজীবন : আব্দুল হামিদ খান ভাসানী টাঙ্গাইল জেলার কাগমারীতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু সাধারন জনগণের উপর জমিদারদের অত্যাচার তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তিনি সেগুলোর প্রতিবাদ জানাতেন। এই জন্য জমিদার ও সরকার তাঁকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে তিনি কাগমারী ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার চাকরি আর থাকেনি।
জমিদার-মহাজনদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম : প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়ার পর আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পাবনায় চলে যান। সেখানে কৃষকদের দুর্দশার চিত্র দেখে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। অতিরিক্ত হারে কৃষকদের কাছ থেকে জমিদার ও মহাজনরা সুদ নিত। সুদের টাকা যোগাতে না পেরে এবং ঋণশোধ করতে না পেরে কৃষকদেরকে জমি ও ভিটে মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হতে হতো। জমিদার ও মহাজনরাই সেই সম্পদ দখল করে নিত। এসবের বিরুদ্ধে আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বিক্ষুব্ধ হন। তিনি জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে থাকেন। ফলে জমিদার ও মহাজনদেরও ভয় বাড়তে থাকে।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড : কৃষকদের সংঘটিত করার মধ্য দিয়ে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী জড়িয়ে পড়েন জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯১৯ সালে যোগ দেন জাতীয় কংগ্রেসে। এরপর কারারুদ্ধ অবস্থায় তাকে দীর্ঘ ১৭ মাস অতিবাহিত করতে হয়। তার মধ্যে রাজনৈতিক বোধের বিকাশ ঘটতে থাকে। তিনি বুঝতে পারেন, দেশের কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করাই হবে তার প্রধান কাজ। তাদেরকে সংঘটিত করতে না পারলে দেশকে শোষণমুক্ত করা সম্ভব হবে না।
মাওলানা আব্দুল হামিদ খানের নেতৃত্বে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা প্রভৃতি জেলার কৃষকরা সংঘটিত হতে থাকে। বড় বড় কৃষক সমাবেশ হতে লাগল। এতে জমিদাররা ভীতু হয়ে পড়ল। মাওলানা ভাসানীর এই তৎপরতা ঠেকানোর জন্য আব্দুল হামিদ খান ভাষাণীকে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়। কিন্তু তাতেই মওলানা ভাসানী দমে যাননি। তিনি আসামে গিয়ে আশ্রয় নেন।
আসামে ভাসানীর সংগ্রাম : আসামে আশ্রয় নেওয়ার পর সেখানেও কৃষকদের করুন অবস্থা দেখে মাওলানা ভাসানী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি যখন আসামে পৌঁছান, তখন সেখানে প্রায় ৫ লাখ কৃষক ভিটেজমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে দিন কাটাচ্ছে।
আসামের বাঙালি ও আসামিদের মধ্যে জাতিগত সংকট প্রবল হয়ে উঠল। ব্রিটিশ সরকার পৃথকভাবে বসবাসের জন্য আলাদা সীমানা চিহ্নিত করল। কিন্তু তাতে সমাধান না হলে মাওলানা ভাসানী নির্যাতিত বাঙ্গালীদের পাশে দাঁড়িয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করলেন। আসামের জমিদারদের অত্যাচারে নির্যাতিত মুসলমান কৃষকরা দলে দলে মাওলানা আব্দুল হামিদ খানের কাছে দিকনির্দেশনা পাওয়ার আশায় যেতে লাগল। ১৯৪২ সালে আসামের ধুবড়ি জেলার ভাসানচর এলাকায় বাঙালি কৃষকদের বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই আব্দুল হামিদ খানের নাম হয় ‘মাওলানা ভাসানী’। আসামে থাকাকালীন তাকে দীর্ঘ আট বছর জেল খাটতে হয়েছে। এমনকি দেশভাগের সময়ও তাকে কারাগারে বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছে। এভাবেই ভাসানী হয়ে উঠলেন জনমানুষের নেতা।
পর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে মাওলানা ভাসানী : ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও এদেশের সাধারণ জনগণ সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বাদ পায় না। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণের অধিকার হরণ করতে থাকে। এ অবস্থায় মাওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। তিনি এই দলের সভাপতি ছিলেন।
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের উপর যে বৈষম্যমূলক আচরণ করত, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মাওলানা ভাসানী রাজনৈতিক সংগ্রাম শুরু করেন। পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক সংকট, ঐতিহ্য ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ তীব্র রূপ ধারণ করে। মাওলানা ভাসানী নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালে ভুখা মিছিল বের হয়। এতে মাওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে জেল থেকে বের হয় তিনি যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন, যা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়। পাকিস্তান আমলের প্রায় সকল আন্দোলনের নেতৃত্বেই ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল গণজোয়ারেও তিনি ছিলেন সরব।
স্বাধীনতা যুদ্ধে মাওলানা ভাসানী : মাওলানা ভাসানী স্বপ্ন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। ১৯৭১ সালের বিভিন্ন জনসভায় তিনি এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। পাকিস্তানিদের তিনি ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন। তিনি জীবিত থাকাকালীন সময়ে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ করে এবং বিশ্বের দরবারে লাল সবুজের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরে।
মাওলানা ভাসানীর জীবনযাপন : মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বড় মাপের নেতা হয়েও অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তালপাতার আঁশের টুপি, খদ্দরের পাজামা-পাঞ্জাবি, আর সাদা লুঙ্গি ছিল তার প্রতিমুহূর্তের পোশাক। এই সাধারণ পোশাকেই তিনি ঘুরে বেড়াতেন বহু দেশে। তার বসবাসের জন্য ছিল একটি কুঁড়েঘর, বাঁশের বেড়া, শণের ছাউনি আর মাটির মেঝে। একটি চৌকি ছাড়া ঘরের ভেতর তেমন আসবাব ছিল না। মাওলানা ভাসানীর খাদ্য অভ্যাস ছিল অতি সাধারণ। ভাত, মাছের চচ্চড়ি, শাক, ডাল, বেগুন ভর্তা দুধের পিঠা ইত্যাদি ছিল মাওলানা ভাসানীর প্রিয় খাবার। মানুষকে খাওয়াতে পারলে তিনি খুব খুশি হতেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান : আজীবন সংগ্রামী মাওলানা ভাসানী মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করার লক্ষ্যে শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। মহীপুরের হাজী মুহসিন কলেজ,ঢাকার আবুজর গিফারী কলেজ, টাঙ্গাইলের মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখযোগ্য। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে মওলানা ভাসানী শিক্ষাবিস্তারে যে অবদান রেখে গেছেন তা অনস্বীকার্য।
জীবনাবসান : ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষে অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
উপসংহার : অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে আজীবন আপসহীন সংগ্রামী ছিলেন মাওলানা ভাসানী। মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদে সংঘটিত করার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানুষের আপনজন, হয়েছিলেন প্রাণের নেতা। অসহায়, নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের অগ্রণী সৈনিক ছিলেন মাওলানা ভাসানী। অনাড়ম্বর জীবনযাপন, সংগ্রামী মনোভাব আর মানুষের প্রতি অকুন্ঠ ভালোবাসা এই গুণাবলীর সমন্বয়েই গড়ে উঠেছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। বর্তমানে দেশ ও সমাজের কল্যাণে মাওলানা ভাসানীর জীবনাদর্শ আমাদের কাছে এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।