ভূমিকা : দুপুর হলো সারা দিনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের নাম। দুপুর বা মধ্যাহ্ন সময়ে দেশের গ্রামবাংলার বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ রয়েছে। আবার শহর বা মফস্বলেরও আছে আলাদা রূপ। আর সেই দুপুর যদি নির্জনে কাটে, তাহলে তার অভিজ্ঞতা অবশ্যই বিনিময়ের দাবি রাখে। দুপুর বেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো – এ সময় সূর্যকিরণ সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় বিকিরিত হয়,সূর্য মাথার উপর আসে আর রোদ প্রখর হয়। এই প্রখর রোদে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর তারা বিশ্রামের জন্য আশ্রয় খোঁজে। প্রকৃতিও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শহর ও গ্রাম ভেদে দুপুরের ভিন্ন রকম চিত্র ফুটে ওঠে।
দুপুরে পল্লীবাংলা : সবুজে ঘেরা পল্লীর পথে-প্রান্তরে যখন সকাল গড়িয়ে দুপুর আসে, বাড়ির মানুষগুলো তখন ঘরে অবস্থান করে। রোদের তাপ প্রচন্ড থাকায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদেরকে বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়। আর গৃহবধূরা রান্নার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। কেউবা কলসি নিয়ে নদী কিংবা পুকুরে পানি আনতে যায়। বাড়ির কর্তারা দুপুরে ক্লান্তি দূর করার জন্য বিশ্রাম নেয়। ছেলে-মেয়েদের কেউ কেউ স্কুল ছুটি হলে বাড়িতে ফিরতে থাকে। প্রচন্ড রোদে কাক ডাকার সুর ভেসে আসে। খাল-বিলের পাশ দিয়ে ধু ধু প্রান্তর চোখে পড়ে। রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কম থাকে। বাজার ফেরত মানুষেরা জিনিসপত্র নিয়ে বাড়িতে ফিরতে থাকে। এ সময় সকলের প্রত্যাশায় থাকে শীতল বাতাসের পরশ। কিন্তু তার অভাবে প্রকৃতি হয়ে পড়ে শুষ্ক ও নিঃস্তব্ধ। হঠাৎ বাতাস এসে মানুষদের হতাশা দূর করে দেয়। সকলের মনে ফিরে আসে একটুখানি স্বস্তির সুখ। রাখালেরা গরু গুলোকে ঘাস খেতে দিয়ে গামছা বিছিয়ে শুয়ে বিশ্রাম নেয়। অনেক সময় দুপুরে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যায়। গাছের ডালে পাখিগুলোকে দেখা যায় বিশ্রাম নিতে এবং অল্প ডাকাডাকি করে। গ্রামের চিত্রগুলো দুপুরে যেন একেবারে ভিন্নরূপ ধারণ করে।
দুপুরের শহর : দুপুরে শহরের বাস্তব অবস্থা গ্রামের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা শহরের রাস্তাগুলোতে কর্মব্যস্ত মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। দুপুরে ও মানুষ ব্যস্ত সময় কাটায়, রাস্তার মানুষগুলো প্রচন্ড রোদে চলাচল করে। ফুটপাতের দোকান থেকে লেবুর শরবত খাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। মানুষ সে সময় প্রখর গরমে কোনো ভবনের নিচে ঠাঁই নিতে পারলেই যেন বাঁচে। তবে কেউ কেউ রোদে ছাতা ব্যবহার করে। দুপুরে হঠাৎ ফুটপাতে একটু ছায়ায় দৃষ্টি রাখলে দেখা যায় অসহায় মানুষের করুণ ভঙ্গিতে ঘুমন্ত দেহ। এমন দৃশ্য কারো কারো বিবেককে নাড়া দিলেও শহরের ব্যস্ত জীবনে অনেকেরই সহ্য হয়ে যায়। শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুপুরের বিরতিতে শিক্ষার্থীরা অর্থ-আহার সেরে নেই। কখনও বা ছুটি হয়ে গেলে তারা বাসায় ফিরে যায়। দুপুরের রাস্তায় কোথাও ছায়া এলাকায় ক্লান্ত রিক্সাওয়ালাকে রিক্সার উপরেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঘুমাতে দেখা যায়। শহরের সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘লাঞ্চব্রেক’ দেওয়া হয়। এ সময় খাওয়ার পর সকলে একটু বিশ্রাম নিতে পারে। দুপুরে হঠাৎ মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনির সুর ভেসে আসে। শহরের রেস্টুরেন্ট বা খাবারের দোকান/ হোটেলগুলোতে মানুষের ভিড় জমে যায়। রাস্তায় গাড়ির ভিড় কিছুটা কম থাকে। তবে সব সময় এরূপ দৃশ্য নাও হতে পারে। এছাড়া শহরে আরও বিভিন্ন চিত্র দুপুরে চোখে পড়ে।
একটি নির্জন দুপুরের অভিজ্ঞতা : সময়টি ছিল গ্রীষ্ম আর জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময়। রোদ্রময় গ্রীষ্মের এক তপ্ত দুপুরের কথা বলছি। তপ্তময় রৌদ্রের প্রখরতায় মনে হচ্ছে আকাশ থেকে যেন অগ্নিবর্ষণ হচ্ছে। সেই অগ্নি দহনে পুড়ছে গাছপালা, পশুপাখি, মানুষজন- সমস্ত প্রকৃতি। রাস্তায় কোনো লোকজনের আনাগোনা ছিল না। আমি গ্রামে মাটির কুঠিতে একা ছিলাম। সেই কুঠির চারপাশে নানান রকম ফলের গাছ যেমন: আম, জাম, কাঁঠাল, তেতুল, পেয়ারা ইত্যাদি। মাঝে মাঝে প্রবাহিত হতো উত্তপ্ত বাতাস। তপ্ত হাওয়ার দমকা মাটিতে লুটিয়ে থাকা শুকনো পাতার দলকে উড়িয়ে নিয়ে যায় কোনো সুদূরে। শুখনো পাতার এ মর্মর ধ্বনি দুপুরের নির্জনতাকে আরো বেদনাবিধুর করে তুলল। আমি যেন আচ্ছন্ন হয়ে বসে রইলাম। হঠাৎ করে কাকের ডাক আমার আচ্ছন্নতাকে ভেঙে দিল। দেখতে পেলাম কাকটি পানির পিপাসায় কাতর হয়ে আছে। কাকের সেই কাতর দৃশ্য দেখে আমার মধ্যে এক অদ্ভুত শিহরণ ঘটে গেল। কেননা, ঐ কাকটির মতো কত অসহায় মানুষও যে দিন পার করছে তার খোঁজ কি আমরা রাখি? আমার মনের মধ্যে অপরাধ বোধ জেগে উঠল। হয়তো এমন সময়ে অন্য কোথাও একজন ক্ষুধার্ত মানুষও খাবারের জন্য হাহাকার করছে। কিন্তু সেই মানুষগুলোর জন্য আমি কি কিছু করতে পেরেছি? এই কষ্টবোধ নিয়ে অনেকক্ষণ যাবৎ আচ্ছন্ন অবস্থায় কাটালাম। হঠাৎ মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনিতে প্রকৃতিস্থ হলাম। দুপুরের নির্জনতা আমার মাঝে এক নতুন বোধের জন্ম দিল। মানুষের কল্যাণে নিজের জীবনকে নিয়োজিত করার সংকল্প আমি সেদিনই গ্রহণ করেছিলাম। তাই সেই দিনের নির্জন দুপুরের স্মৃতি আমি কখনো ভুলতে পারবো না। আমার জীবনের স্মরণীয় দিনগুলোর মধ্যে সেদিনের নির্জন দুপুরের স্মৃতি অবক্ষয় ও অমর হয়ে থাকবে।
নির্জন দুপুরে প্রকৃতিজগৎ : প্রকৃতি নির্জন দুপুরে ভিন্ন রকম রূপ ধারণ করে। প্রকৃতির রূপ, রস, গন্ধ-সবই যেন হারিয়ে যায়। মাঝে মাঝে পাখির ডাক কানে আসে। তাতে তেমন প্রাণ থাকে না। রাখালের বাঁশির সুর ভেসে এলেও তাতে যেন ক্লান্তি জড়ানো থাকে।
নির্জন দুপুরে কবি মন : কবি বা চিন্তাশীল মানুষেরা নির্জন দুপুরকে বেছে নেন কোনো সৃষ্টিশীল কর্মের জন্য। প্রচলিত বৃষ্টির বাইরে একটু আলাদা দৃষ্টিতে তারা জীবন ও জগতকে ভাবতে থাকেন। ফলে সৃষ্টিশীল কর্মের বিস্তৃতি ঘটে। তাই নির্জন দুপুর সুখ মানুষদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উপসংহার : দুপুর একসময় নির্জনতা কাটিয়ে বিদায় নেয়। সূর্য হারিয়ে ফেলে তার প্রখরতা। প্রকৃতির কোলে নেমে আসে সন্ধ্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার। সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে তখন চিনতে হয় প্রকৃতিজগৎকে। বৈকালির কলরব ম্লান হয়ে ঝিমিয়ে আসে সায়াহ্ন সংগীত। কর্মচঞ্চল মানুষেরা নতুন উদ্যমে কর্ম শুরু করে। সকাল-সন্ধ্যার মতো দুপুরেও রয়েছে নিজস্বতা। তারও রয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্যই আমাদের জীবনে নিয়ে আসে বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব।