ভূমিকা : বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা হলো যৌন হয়রানি। এই ঘটনা সমাজ জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কোনো পরিবারই এ সমস্যা থেকে মুক্তি নয়। নৈতিকতা, মূল্যবোধ ,সততা ইত্যাদি ভিত্তির ভগ্নদশা থেকেই ধীরে ধীরে এই সামাজিক সমস্যা বিস্তার লাভ করছে। তাই সমাজকে এই ভয়ংকর ব্যাধির হাত থেকে রক্ষা করতে এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
যৌন হয়রানি : সমাজে ‘ইভটিজিং’ শব্দটির প্রচলন থাকলেও যৌন হয়রানি আরও বড় ধরনের অপরাধ। ‘ইভটিজিং’ হচ্ছে নারীদেরকে উত্ত্যক্তকরণ। ভারতীয় উপমহাদেশে এই অর্থই প্রচলিত। তবে এর মাধ্যমে ‘ইভটিজিং’ কে বিশ্লেষণ করলে চলে না, কারণ এটি মূলত একপ্রকার ইউফেমিজম; যার পেছনে থাকে নির্লজ্জ যৌনতা। কিছু কিছু দেশে ‘ইভটিজিং’ কে ‘সেক্সচুয়াল হেরাসমেন্ট’ বলা হয়। তবে বাংলাদেশে বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। উচ্চ আদালত কর্তৃক ‘নারী উত্ত্যকরণ’কে যৌন হয়রানীর আওতায় বিবেচনা করে শাস্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যৌন হয়রানি বলতে মূলত ‘ইভটিজিং’ অপেক্ষা অধিক ও গুরুতর অনৈতিক আচরণ ও অপরাধকে বোঝানো হয়ে থাকে।
যৌন হয়রানির ধরন : রাস্তায় চলাচলকৃত অবস্থায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে এমনকি ঘরেও নারী কিংবা মেয়েরা যৌন হয়রানির শিকার হয়। বখাটে ছেলেদের অশ্লীল মন্তব্য, চোখ ইশারা, শিস, বাজে ইঙ্গিত দেওয়া ইত্যাদি অঙ্গভঙ্গি যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করার মাধ্যমেও যৌন হয়রানির মত ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয়।
যৌন হয়রানির শিকার যারা : কিশোরী বয়সের মেয়েরাই বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয়। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা এই হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। এমনকি কর্মজীবী নারীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হয়। অনেক গৃহকর্মী ও গার্মেন্টসের নারীরাও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকারাও এই আতঙ্ক থেকে মুক্ত নন। এই ধরনের ঘটনা একের পর এক বেড়ে চলেছে, যা সমাজের উপর ভয়ংকর হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশ ও সাম্প্রতিক বাস্তবতা : বিগত কয়েক বছর যাবত ধরে বাংলাদেশে যৌন নিপীড়নের ঘটনার সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার, এ সকল ঘটনার রয়েছে মাত্রাগত ভিন্নতা। এ সকল ঘটনার ফলে স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর বখাটেদের আক্রমণ প্রভৃতি লোমহর্ষক ঘটনা দেশের ভবিষ্যৎ কে এক ভয়াবহ হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। এ ঘটনাগুলো আমাদের দেশে যৌন হয়রানি নামে পরিচিত, এই সামাজিক ব্যাধির সংক্রমণ রোধ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ব্যাধির আক্রমণ সমাজের প্রত্যেকটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচন ধরাবে।
যৌন হয়রানির কুফল : যে মেয়েটি যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে, সে সম্পূর্ণভাবে তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। যার ফলে সে সমাজের কাউকেই বিশ্বাস করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে লাঞ্চিত মেয়েটি অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এরকম নিয়মিত আত্মহত্যার ঘটনা পত্রিকার পাতা খুললে চোখে পড়ে। যৌন হয়রানির শিকার যে মেয়েটি, তার গ্লানি পরিবারের সবাইকে সহ্য করতে হয়। বেশিরভাগ পরিবারে নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেয়েকে বেশি পড়ালেখা করাতে চান না। আবার অনেক পরিবার এ সকল ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের যৌন হয়রানি ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ঘটনা ঘটে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে। কর্মজীবী নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হয়ে কিংবা যৌন হয়রানি এড়াতে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। ফলে নারীদের কর্মসংস্থানের পথে যৌন হয়রানির ঘটনা দিন দিন বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমাজের যৌন হয়রানির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণে কোনো মেয়ে তার পাশের বন্ধুর সঙ্গেও এখন চলতে ভয় পায়। কেননা,মিষ্টি কথার মাধ্যমে ছদ্মবেশ ধারণ করে অনেকেই যৌন নিপীড়ন করে থাকে। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে গিয়েও এই মানসিক বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
যৌন হয়রানির কারণ : সমাজে অহরহ অনৈতিক ঘটনা ঘটছে তার মধ্যে যৌন হয়রানি একটি। এর ফলে ভাঙতে বসেছে সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন। ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে অসহায় ও নির্যাতিত নারীর আত্মহত্যার সংখ্যা। এ ঘটনার শিকার শুধুমাত্র একজন মেয়ে অথবা নারীই নয়, বরং প্রতিবাদকারী স্বজন বা অভিভাবকদেরকেও নির্যাতন সহ মৃত্যুর মুখে পতিত হতে হচ্ছে। সমাজের উন্নতিকল্পে এই মরণ ব্যাধির কারণগুলো খুঁজে বের করা দরকার। তাহলেই তা নির্মূলের জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
নিচে যৌন হয়রানির সামাজিক কারণগুলো উল্লেখ করা হলো :
১. উন্নত নৈতিকতা মূল্যবোধ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন না থাকার ফলে যুবসমাজ উন্নত জীবনের স্বপ্নে নিজেকে গড়ে তুলতে পারছে না। এজন্য অনৈতিক পথে তারা আনন্দ-উল্লাস করাকে গ্রহণ করছে।
২. পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের সম অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই বিভিন্নভাবে নারীদেরকে অসহায়, দুর্বল ভাবার মানসিকতা বিরাজ করছে। সেই ভাবনা থেকেই নারীদের উপর যৌন আক্রমণের ঘটনা ঘটে।
৩. প্রচলিত সমাজের অর্থনীতি মূলত মুনাফাভিত্তিক। তাই মুনাফা লাভের আশায় যেকোনো ধরনের ব্যবসা চালু হয়। এক্ষেত্রে মানুষের নৈতিকতা, মনুষ্যত্ববোধ, সততা প্রভৃতির কথা গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। মাদক ব্যবস্থা পর্নোগ্রাফির ব্যবসা মদ গাঁজা ইত্যাদি এমন কোন শহর নেই যেখানে তার বিস্তার ঘটছে না। ফলে যুবকরা খুব সহজেই মাদকাসক্ত হয়ে অধঃপতিত জীবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং যৌন নিপীড়নের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হচ্ছে।
৪. বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন এবং হাতে হাতে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হওয়ার ফলে খুব সহজেই একজনের মোবাইল থেকে অন্যজন অশ্লীল বা নোংরা কুরুচিপূর্ণ ছবি বা ভিডিও ডাউনলোড করতে পারে। যা যুবসমাজের ভোগবাদী মানসিকতাকে এমনভাবে উস্কে দেয়া হচ্ছে।
৫. সমাজে যৌন নিপীড়নের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়ার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকেই এমন অপকর্ম করতে উৎসাহি হয়।
সমাজের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীই নারী। সেই নারী সমাজকে নিরাপত্তাহীনতার মাঝে রেখে এ সমাজ কখনোই সামনে এগোতে পারবে না। নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যৌন হয়রানির মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যধিকে কার্যকারণ দ্বারা বুঝতে হবে।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধের উপায় ও করণীয় : যৌন হয়রানি প্রতিরোধে পারিবারিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে সচেতন মহলকে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। আইনের প্রয়োগ ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ নিম্নে পদক্ষেপগুলো গ্রহন করা যেতে পারে—
১. সমাজে অপসংস্কৃতির বিস্তার রোধ করতে হবে এবং অপসংস্কৃতি রোধে গণমাধ্যমসমূহকে সতর্ক করেতে হবে।
২. মাদক-পর্নোগ্রাফিসহ যুব সমাজের অবক্ষয় ডেকে আনে এ রকম যে কোনো জিনিসের ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে।
৩. নাটক, সিনেমা অথবা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে নারীদেহের অশ্লীল উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে।
৪. নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সততা মনীষীদের জীবনী প্রভৃতি পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৫. শিক্ষিত বা অশিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে তাদেরকে অসৎ কর্ম থেকে বিরত রাখতে হবে।
৬. যৌন নিপীড়নকারীদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে।
৭ যৌন নিপীড়ন বন্ধে নতুন করে কঠোর আইনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রেই যৌন হয়রানি রোধে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একজন ব্যক্তিকে যেমন দায়িত্ব পালন করতে হবে, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজেরও আরো বৃহত্তর পরিসরে কর্তব্য রয়েছে। পরিবার থেকেই আমাদের সচেতনতা সৃষ্টির কাজ শুরু করতে হবে। তাহলেই সমাজ ‘যৌন হয়রানি’ নামক ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করবে।
উপসংহার : একদিকে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা, অন্যদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এরই সুযোগে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে যৌন হয়রানির ঘটনা। এ যেন সংবাদপত্রের নিয়মিত খবর। এই ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত গোটা সমাজ। তাই এই অবস্থার পরিবর্তনে প্রয়োজন যথাযথ জনসচেতনতা, আইনের প্রয়োগ, শাস্তি বিধান এবং কল্যাণচেতনার বিস্তার। আর সেই মহৎ উদ্যোগে রাষ্ট্র ও সরকারের পাশাপাশি সমাজের প্রত্যেক সচেতন ও বিবেকবান ব্যক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই আমরা পেতে পারি ‘যৌন নিপীড়ন’ মুক্ত একটি বাংলাদেশ।
অন্যান্য রচনা
পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
সত্যবাদিতা
প্রতিভা রচনা