ভূমিকা : সময় স্রোতের ক্রমবিবর্তিত জগতে সকল কিছুর মতো শিক্ষার রূপরেখা ও ক্রমবিবর্তনশীল। যে জীবনে শিক্ষা নেই, সে জীবন কখনো কোনো গতিময়তার কথা বলতে পারে না। এ শিক্ষা কোন শিক্ষা নয়, যে শিক্ষায় জীবনের স্পর্শ নেই। বহুকাল ধরে চলে আসা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারার সাথে সংগতিহীন,কাঙ্ক্ষিত যোগসূত্র স্থাপনে ব্যর্থ বলে অনেকে অভিমত প্রকাশ করেন। যার ফলে একদিকে মৃত্তিকার সাথে সংযোগহীন শিক্ষা ব্যবস্থা, অপরদিকে অশিক্ষা ও দারিদ্রজর্জরিত জনসংখ্যা দেশে এক ধরনের পিছুটানের সৃষ্টি করেছে। কর্মময় জীবনের সাধারন স্তর এবং পুঁথিগত শিক্ষার সঙ্গে সীমাহীন পার্থক্য থাকার কারণে প্রচলিত শিক্ষা আমাদের কর্মময় জীবনের সাথে চলতে পারে না। তাই কর্মমুখী শিক্ষা বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
কর্মমুখী বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা : নানা রকমের পেশা বা বৃত্তির নিশ্চয়তার মাধ্যমে হাতে-কলমে যে শিক্ষা ব্যবস্থা জীবনের প্রত্যেক কর্মের সাথে জড়িয়ে আছে তাকেই কর্মমুখী বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা বলে। মূলত এটি কর্মসংস্থান মুখী শিক্ষা, যা দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধানের উপযোগী করে বিজ্ঞানসম্মত ও কারিগরি শিক্ষা বাস্তবায়ন করে।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা : বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বাস্তব জীবনের কোনো মিল নেই। কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞানসম্মত নয়। বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মাঝে কর্মী হওয়ার মনোভাবের পরিবর্তে কেরানি হওয়ার মনোভাব সৃষ্টি হয়। শিক্ষাব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত কোনো আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাপদ্ধতির আগমন ঘটেনি। শিক্ষার্থীরা শুধু সার্টিফিকেট অর্জন ও চাকরির পেছনে ছুটছে। আমরা জ্ঞান অর্জনের জন্য লেখাপড়া করি না। এমনকি আমরা শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ করি না। এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রকৃত মেধাবীদের মেধার মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিবছর এদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যাচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় অল্প মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেই। আর এই শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিণতি বেকারত্ব ছাড়া আর কিছু নয়। হাজারো শিক্ষার্থী এই বেকারত্বের অভিশাপে আজ দিশেহারা। এজন্য তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনধারায় কোনো অবদান রাখতে পারছে না। তাই এই জটিল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি : শৈশবকাল থেকেই আমাদের শিক্ষার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য যা কিছু আবশ্যক তাই মুখস্ত করায় যেন আমাদের প্রধান কাজ। আমরা জানি — ‘বিদ্যার সাথে সম্পর্কহীন জীবন অন্ধ এবং জীবনের সাথে সম্পর্কহীন বিদ্যা পঙ্গু।’ ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রথাবন্ধ ভ্রান্ত পদ্ধতি এবং পুঁথিগত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে। যে কারণে এর দ্বারা দেশের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রবিজ্ঞান ও কারিগর সৃষ্টি হয়নি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাস করা ব্যক্তিদের অন্য সমস্যারও তেমন সমাধান হয়নি। আচার্য কুমার দত্ত ঠিকই বলেছেন, ‘বাঙালিরা বিলাস বেসনে গা ঢালিয়ে দিয়াছে। তাহারা বিদ্যা শিক্ষা করে ডিগ্রি লাভ করে শুধু আরামে কাজ করিবার জন্য তাই তাহাদের কেরানীগিরি ছাড়া গত্যন্তর নাই।’ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বর্তমান যুগে এসে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য সর্বত্রই যন্ত্রকুশলতার যেখানে স্পর্শ, সেখানে কলম পিষে জীবিকা অর্জনের প্রচেষ্টা অনেকটা হাস্যকরও বটে।
বাংলাদেশের বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা : আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আগে যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। যদিও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্দেশ্যে ‘স্যাডলার কমিশন’, ড.কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন, ‘বাতেন কমিশন’, ‘বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ এবং ‘মজিদ খানের শিক্ষানীতি’ ইত্যাদি কমিশন গঠন করা হয়েছে। তবুও এ সকল ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অগ্রগতি সাধিত হয়নি। এজন্য আমাদের দেশে আজ শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীকে যথার্থ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারেনি। অবশ্য সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মাধ্যমিক শ্রেণীতে কৃষি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে পাশাপাশি ভোকেশনাল প্রোগ্রামও চালু করেছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক।
উন্নত দেশের প্রেক্ষিত : পৃথিবীর ধনী দেশগুলোতে পরিকল্পিত বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। উন্নত বিশ্বে যে সকল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে তাতে কেরানি হওয়ার কোন সুযোগ নেই ; সুযোগ আছে বিজ্ঞানী হওয়ার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ব্রিটেন, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশ উৎপাদনমুখী অথবা বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে উন্নতির শিখরে আহরণ করেছে।
বৃত্তিমূলক শিক্ষক গ্রহণে অনীহা : বহু যুগ ধরে অনগ্রসর ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন এদেশে কর্মমুখী শিক্ষা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তেমন অবদান রাখেনি। আমাদের দেশে এই বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে তুচ্ছ ও অসম্মানের কাজ বলে মনে করা হয়। শ্রেণীগত বৈষম্যের ফলে অভিজাত শ্রেণীর অনেকে এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণীও এ শিক্ষায় তেমন আগ্রহ দেখায় না। এমন মানসিকতার কারণে বৃত্তিমূলক শিক্ষা তেমন মূল্য পায়নি। মূল্যবোধের প্রচলিত ধ্যান ধারনায় কায়িক শ্রম করতে আমরা লজ্জা বোধ করি। এজন্য কর্মমুখী শিক্ষা থেকে গেছে অবহেলিত।
কর্মমুখী শিক্ষার উপকারিতা : বৃত্তিমূলক ও কর্মমুখী শিক্ষার নানা ধরনের সুবিধা রয়েছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ রচনা করে কর্মমুখী শিক্ষা। এর দ্বারা সমাজের প্রত্যেকটি পরিবার অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করতে পারে। নিম্নে কর্মমুখী শিক্ষার উপকারিতা তুলে ধরা হলো —
১. এ শিক্ষা বেকার সমস্যা হ্রাস করে এবং অশান্তির আশঙ্কাকে দূর করে।
২. এ শিক্ষার ফলে কাজ সহজেই পাওয়া যায়, সেজন্য অবশ্যই কাজের ক্ষেত্রটা প্রস্তুত থাকতে হবে।
৩. এ শিক্ষার মাধ্যমে অধিক উপার্জন সম্ভব, এবং এর ফলে পুঁজি সমৃদ্ধশালী হয়।
৪. এ শিক্ষা মানুষকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলা।
৫. কৃষিক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন এবং শিল্পক্ষেত্রে অধিক পণ্য উৎপাদনের কারণে অধিক মুনাফা অর্জিত হয় এবং বেকার সমস্যার সমাধান লাঘব ঘটে।
বৃত্তিমূলক নেতিবাচক দিক : বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি সমালোচকদের অভিযোগের শেষ নেই। কেউ কেউ মনে করেন, এর দ্বারা কল্পনাশক্তির বিনাশ ঘটে। এ শিক্ষা মানুষকে বেশি বাস্তবমুখী করে তোলে। রূঢ় বাস্তবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের কারণে মানুষ সূক্ষ্ম ও উচ্চ চিন্তা থেকে বিরত হয়, মানুষের সুকুমার হৃদয় বৃত্তির প্রবাহকে স্তব্ধ করে দেয়। আস্তে আস্তে মানুষের জীবন স্বার্থপর হয়ে ওঠে।
কর্মমুখী শিক্ষার বর্তমান অবস্থা : বাংলাদেশে বর্তমান কর্মমুখী শিক্ষার অবস্থা খুবই নিম্নমানের। শিক্ষাব্যবস্থার এ দুরবস্থা দেখে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ, শিক্ষা কমিশনসমূহ কর্মমুখী শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এখনো কর্মমুখী শিক্ষাকে ছোট করে দেখা হয়। আমাদের দেশে বেকার সমস্যা এবং দক্ষ কর্মীর অভাবের মূল কারণ হলো কর্মমুখী শিক্ষার অভাব। তাই এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তার করতে হবে।
কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার : ক্রমাগত আমাদের দেশে কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার হচ্ছে। সরকারও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ও মান উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে। কৃষিকাজে সহায়ক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি করতে হবে। তবেই আমরা কৃষিক্ষেত্রে প্রকৃত উন্নতি সাধন করতে পারব। এছাড়া যে সকল প্রতিষ্ঠান আছে, সেখানে নতুন বিষয় সংযুক্ত করতে হবে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ধারা আমরা দেশকে শিল্পসমৃদ্ধ ও উন্নয়ন দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। এজন্য সবাইকে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে।
উপসংহার : আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি হলো শুধু পুস্তকনির্ভর জ্ঞানের মাপকাঠি। যে শিক্ষা ছাত্রদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা, তাদের সৃজনশীল প্রতিভা কিংবা অপরকে সহযোগিতা করার প্রবণতাকে জাগিয়ে না তোলে সে শিক্ষা কখনো পরিপূর্ণ নয়। ডিগ্রী বা চাকরির মোহ জাতির কর্মদক্ষতাকে পঙ্গু করে ফেলে। তাই নতুন যুগোপযোগী শিক্ষার দুয়ারগুলো একেবারে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। জীবনের নানা ধরনের অভিব্যক্তির প্রকাশ তখন পূর্ণতা লাভ করবে এবং দেশ ও জাতি হবে উন্নত সমৃদ্ধ।
অন্যান্য রচনা
জনসংখ্যা সমস্যা
ছাত্র জীবন
সমাজ জীবনে দুর্নীতি