ভূমিকা : অর্থনীতি হলো একটি সমাজের মূলভিত্তি। অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই সাংস্কৃতিক, সামাজিক,রাজনৈতিক ইত্যাদি পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটে থাকে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপর মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রভৃতি নির্ভরশীল। আর অর্থনৈতিক পরিবর্তন মানুষের চিন্তাচেতনাও সমাজকাঠামোর উপর প্রভাব বিস্তার করে। আধুনিক অর্থনৈতিতে মুক্তবাজারের কথা বিশ্বমহলে জোরেশোরেই বিস্তারিত হচ্ছে, যা পণ্যভোক্তা মানুষের মনে নানা চিন্তা সৃষ্টি করছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি সম্পর্কে মানুষের ইচ্ছা ক্রমে বাড়ছে। তাই এর সম্পর্কে যেমন সম্যক ধারণা গড়ে তোলা প্রয়োজন, তেমনি সমাজে এর নেতিবাচক ও ইতিবাচক ভূমিকাও তুলে ধরা কর্তব্য।
মুক্তবাজার অর্থনীতি : মুক্তবাজার অর্থনীতি সম্পর্কে অনেকেই জ্ঞাত নয়। কিন্তু আমাদের দেশেও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রচলন রয়েছে। ইংরেজি ভাষায় ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’কে বলা হয় ‘Free Enterprise Economy’। অর্থাৎ সাধারণ কোনো বাধাবিপত্তি বা প্রতিকূলতা ছাড়াই একটি দেশের ভেতরে বা বাইরে যেকোনো ধরনের পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের সুবিধা বা নিয়ম-কানুন অব্যাহত রাখাই হচ্ছে মুক্তবাজার। এটি এমন ধরনের অর্থনৈতিক পদ্ধতি, যেখানে পণ্য বা সেবার দাম নির্ধারণের দায়িত্বটা বাজারের শক্তিসমূহ ও সরবরাহের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তবাজারের অন্য নাম হলো খোলা বাজার। মুক্তবাজার অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হলো বাজার। বাজার অর্থনীতির কাজ হলো একচেটিয়া বা আধা একচেটিয়া বাজারের প্রভাব বিনষ্ট করে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করা। এতে ভোক্তাগণ দর-কষাকষি করে পছন্দের দ্রব্যটি কিনতে পারে। ফলে কম মূল্যের কিন্তু ভালো মানের পণ্যটি তারা বাজার থেকে বেছে নিতে পারেন।
মুক্তবাজার অর্থনীতির উপাদান : মুক্তবাজার অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। সেগুলো নিম্নরূপ –
> বাণিজ্য উদারীকরণ
> আন্তর্জাতিকীকরণ
> নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ
> ব্যক্তিমালিকানা প্রদান।
মুক্তবাজার অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য : যেকোনো পণ্যের বাজারে কোনো না কোনো ভৌগোলিক সীমারেখার আবদ্ধ। কোনো দেশের উৎপাদিত পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে যখন ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে অবাধ প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং এর ফলে পণ্যের মূল্যমান দাঁড়ানোর পদ্ধতিই হলো বাজার। মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়টি পরস্পর সম্পর্কিত। অর্থাৎ চাহিদাবিধি ও যোগানবিধি অনুযায়ী পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয়। আর অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াতেই চলে বাজার অর্থনীতি। পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতিযোগিতায় বাজারের স্বাভাবিক শক্তি তথা চাহিদা ও যোগানের মধ্যে যখন নিয়ন্ত্রণহীনতা দেখা দেয়, তখনই বিকশিত হয় মুক্তবাজার অর্থনীতি। মুক্তবাজার অর্থনীতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে। বৈশিষ্ট্য গুলোর নিচে উল্লেখ করা হলো –
> Market Mechanism এ পণ্যের দাম নির্ধারিত হবে।
> সরকার কোনো পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে না।
> আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো বিধি-নিষেধ থাকবে না।
> কোনো পণ্যের উপর Tariff Protection থাকবে না।
> বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করা হবে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির ইতিবাচক দিক : মুক্তবাজার অর্থনীতি বাংলাদেশেও প্রচলিত আছে। ভোক্তাদের যতটুকু সুবিধা দিতে পারে এ মুক্তবাজার অর্থনীতি তা বিবেচ্য। যে কোনো দেশের মানুষের জীবনের উন্নয়ন ও অবনয়ন দুটিই অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। তাই জীবনমান নির্ধারণও উন্নয়নের ক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতির ভূমিকা সম্পর্কে সকলেরই অবহিত হওয়া প্রয়োজন। নিচে মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবিধা বা ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হলো :
১। মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে ভোক্তাগণ স্বল্পমূল্যে বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করতে পারে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকায় তুলনামূলকভাবে কম মূল্যে ভালো মানের পণ্য কেনা ক্রতাদের পক্ষে সহজ হয়।
২। বিভিন্ন দেশ থেকে যেমন বিদেশি পণ্যের আমদানি হয়, তেমনি দেশীয় পণ্যও বিভিন্ন দেশের রপ্তানি হয়। ফলে রপ্তানির মাধ্যমে দেশ অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে।
৩। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবাধ অর্থ প্রবাহ বিদ্যমান থাকে। ফলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে যায় না।
৪। যোগাযোগ ও পরিবহনে পণ্য আনা-নেওয়ার কারণে এই দুই খাতের সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। ফলে দেশ আরও সমৃদ্ধ হয়।
৫। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নতুন নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি হয় এবং দেশের শিল্পায়ন ও বাণিজ্যকীকরণ বৃদ্ধি পেয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।
৬। মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত হয়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার হয়।
৭। বিভিন্ন দেশ নতুন নতুন প্রযুক্তি আনার ফলে নতুন নতুন জ্ঞানের প্রসার ঘটে এবং তার সাহায্যে নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সমৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব হয়।
৮। পণ্যের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যের মান বৃদ্ধি পায়। ফলে ভোক্তাগণ সঠিক মানের পণ্য কিনতে পারেন। এতে বৈদেশিক বাণিজ্যও প্রভাবিত হয়।
৯। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সম্পদের বিকল্প ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।
১০। দরিদ্র দেশগুলোতে আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোনো অনুন্নত দেশ দ্রুত সমৃদ্ধিশালী হওয়ার সুযোগ পায়।
মুক্তবাজার অর্থনীতির নেতিবাচক দিক : মুক্তবাজার অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতির সাথে ঘনিষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও এর রয়েছে কিছু নেতিবাচক দিক। যেমন :
> উন্নত দেশ কর্তৃক অনুন্নত দেশসমূহের বাজার দখল।
> উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনুকরণ প্রবণতা বৃদ্ধি।
> অদক্ষ খাত সমূহে বেকরত্ব বৃদ্ধি।
> দেশীয় পণ্য বা ঐতিহ্যের বিলুপ্তির সম্ভাবনা।
> জনসাধারণের মধ্যে ভোগ বিলাসিতা বৃদ্ধি।
> দেশীয় শিল্প-কারখানার উৎপাদন হ্রাস ইত্যাদি।
মুক্তবাজার অর্থনীতি সম্পর্কে মতামত : অনেকে মুক্তবাজার অর্থনীতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। কেননা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দেশীয় পণ্যের চাহিদা কমে যায় এবং সেই দেশীয় শিল্প-কারখানাগুলো ধ্বংসের মুখে পড়ে। এ বাজার নীতির ফলে বিদেশি পণ্যের বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে বিদেশি শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয় বলে তারা মনে করেন। তারা আরো আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে অনুন্নত দেশে শিল্প-কারখানা মারা যাবে এবং বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাবে।
মুক্তবাজার অর্থনীতি সম্পর্কে আশাবাদী মানুষেরা মনে করেন – মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে দেশীয় শিল্প-কারখানা ধ্বংসের মুখে পড়া এবং বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সর্বক্ষেত্রে তা সত্য নয়। কারণ মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক হাওয়াই সেক্ষেত্রে দেশীয় পণ্যের মান বৃদ্ধি পায়। শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দেশের বেকারত্ব হ্রাস- বৃদ্ধি মূলত শিল্প-কারখানার দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া বেকারত্ব হ্রাস করার জন্যে নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে দেশের শিল্পকেও প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করা উচিত। সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিভিন্ন পণ্য বিলুপ্তের মধ্যে পড়ে যায়। তাই মুক্তবাজার অর্থনীতির সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণারও প্রয়োজন রয়েছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন : ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন। কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রচলিত। এখনো দেশের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি মজবুত ভিত্তি পায়নি। আবার, বাজার অর্থনীতিতে সংরক্ষণবাদিতা না থাকায় অবাধে বিভিন্ন দেশের, বিশেষত ভারতের পণ্য বাংলাদেশের প্রচুর পরিমাণে প্রবেশ করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ কমে যাচ্ছে। ফলে দেশীয় শিল্প-বিস্তার অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ প্রতিবছর বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। কিন্তু সঠিক সময়ে সেই ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় তার বোঝা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অধিক মুনাফার লোভে বৈদেশিক পুঁজি এদেশের বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ফলে সস্তাশ্রমে পণ্য তৈরি করে বিদেশীরা প্রচুর লাভবান হলেও তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবিধাগুলো গ্রহণ করার মাধ্যমে নিজস্ব দেশীয় অর্থনীতি কিভাবে উন্নত করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। তাহলেই দেশের শিল্পের অনগ্রসরতা দূর হবে, বেকারত্ব হ্রাস পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ ত্বরান্বিত হবে।
উপসংহার : প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে মুক্তবাজার অর্থনীতির অপরিহার্য শর্তসমূহ পূরণ করতে হবে। বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশকেও সেই কৌশল অবলম্বন করে দেশীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগী হতে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে পণ্যের মান বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তবেই বাংলাদেশ হবে সমৃদ্ধ ও উন্নত অর্থনীতির দেশ।