ভূমিকা : বাংলাদেশের প্রকৃতি অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী। এদেশ শস্যক্ষেত, শ্যামল প্রান্তর আর সবুজের সমাহার। বাউলের একতারায়, কাব্যের ছন্দে, রাখালের বাঁশিতে যেন সেই রূপেরই প্রশস্তি সংগীত। সেজন্য কবি জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর পরেও আবার এই বাংলায় ফিরে আসতে চেয়েছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানে ফুটে ওঠে সবুজ শ্যামল আর বাংলার মাতৃরূপ। বাংলার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে সেই সবুজ প্রান্তর ও অরণ্য দ্বারা। বাংলাদেশের চারপাশে যে সকল বন-বনানী রয়েছে তা দেশকে করেছে সমৃদ্ধ ও অপরূপ সৌন্দর্য। সেই নিবিড় অরণ্যের বিলাসিতায় একাকী ভ্রমণ হয়ে ওঠে জীবনের এক স্বপ্নময় মুহূর্ত। তেমনই এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলাম একদিন।
অরণ্যে গমন : শৈশব থেকেই বই পড়ে সুন্দরবন সম্পর্কে আমার মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সেখানে ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগই হয়ে ওঠেনি। একবার সেই সুযোগ এলো। আমার অষ্টম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সামনে দীর্ঘদিন ছুটি। তাই বাবাকে অনুরোধ করলাম সুন্দরবনে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাবা আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। বাবা রাজি হয়েছে শুনে আমার যে কত আনন্দ। বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্য এবং সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন হলো সুন্দরবন। সেই সুন্দরবনে বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাবা-মা’র সাথে রওনা হলাম। খুলনা থেকে ছোট্ট একটি জাহাজে করে আমরা সুন্দরবনে পৌঁছে গেলাম।
অরণ্যের সৌন্দর্যশোভা : সুন্দরবনে পৌঁছাতেই আমি অবাক বনে গেলাম। বইয়ের সুন্দরবনের সৌন্দর্যের যে বর্ণনা পড়েছি, বাস্তবে তার থেকে সুন্দরবনের সৌন্দর্য অতি আকর্ষণীয়। চারিদিকে শুধু সারি সারি সবুজ গাছ। দেখে মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল সবুজের সাগর। চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিল অপরূপ বৈচিত্র্যের বৃক্ষ, ফুল, পাখি, প্রজাপতি ইত্যাদি। এমনকি আম, জাম, কাঁঠাল, সুন্দরী, কেওড়া, গড়ান, গেওয়া, নারিকেল, বাঁশ, গোলপাতার ঝোপ প্রভৃতি দেখতে পেলাম। বনফুলের গন্ধ আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
অরণ্যের পুষ্পরাজি : প্রকৃতির নানা রকমের পুষ্পে সুন্দরবন শোভিত হয়ে আছে। যেকোনো কারো মনকে বিমোহিত করতে সক্ষম সেই পুষ্পরাজির সৌন্দর্য। দেখে যেন মনে হয় কোনো এক মহান শিল্পীর মহৎ সৃষ্টিকর্ম যেন জীবন্ত রূপ নিয়ে মানুষকে কাছে টানছে।
অরণ্যের প্রাণীকুল : অজস্র ছড়িয়ে থাকা গাছপালার মধ্যেও সুন্দর ধারণ করে আছে বিচিত্র সব প্রাণীদের। গাছের ডালে ডালে পাখির সুমধুর কলতান, বানরের ছোটাছুটি, কিচির-মিচির শব্দ ইত্যাদি সবকিছু মিলে যেন এক স্বপ্নরাজ্য। নানা রঙের পাখি যেমন : শালিক, চড়ুই, বুলবুলি, বনটিয়া, ঘুঘু, শ্যামা, হরিয়াল প্রভৃতি আমাকে বিমোহিত করেছিল। এই অরণ্য যেন প্রাণীদের এক মহামিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। হরিণ, বাঘ, কুমিরসহ অসংখ্য প্রাণীদেরকে সুন্দরবন নিবিড় স্নেহে আগলে রেখেছে।
অরণ্যে যখন একাকী : একসময় বনের এমন অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার আশায় আমি একা বনের মধ্যে ঘুরতে গেলাম। যতই বনের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকি, ততই যেন তার বিশালতা ফুটে উঠছে। বিভিন্ন ফুলের গন্ধে আমি বিভোর হয়ে যাচ্ছিলাম। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি আমাকে যেন এক রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যাচ্ছিল। পাখির মনোমুগ্ধকর কিচির-মিচির ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম খুব কাছ থেকে। সরীসৃপ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী দ্রুত গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। দেখলাম, আবোধ বিস্ময়ে বড় বড় চোখে একটি হরিণশাবক আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হরিণটির এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আমাকে অতিভূত করেছিল।
অরণ্যের রহস্যময়তা : সুন্দর। বনে গিয়ে আমি তার কিছু রহস্য উদঘাটন করতে পেরেছি। যখন আমি হরিণের দলকে দেখছিলাম, তখন খুবই বিমোহিত হয়েছিলাম। পরক্ষনে আমার কানে কিসের জন্য একটা শব্দ আসতে লাগল। পরক্ষনেই দেখি হরিণের দল দৌড়াতে শুরু করেছে। এই বুঝি ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’ তাদেরকে ধরার জন্য তেড়ে আসছে। আমি সতর্কভাবে সেখান থেকে সরে এলাম। নিজের দুঃসাহস নিও গর্ব হচ্ছিল আমার। এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি।
এক ঝাঁক বানরের দল দেখেছিলাম। একটি মা বানর তার বাচ্চা বানরকে কোলে নিয়ে কিভাবে এক গাছ থেকে অপর গাছে ছুটে চলে, তা দেখে আমি চমৎকৃত হয়েছিলাম। সেটা আমার কাছে অদ্ভুত রহস্য, যা সুন্দরবনের না গেলে হয়তো আর দেখার সুযোগ পেতাম না। এমন কত না রহস্য নিয়ে সুন্দরবন গড়ে উঠেছে।
অরণ্যের ‘না বলা কথা’ : অরণ্য যেহেতু কথা বলতে পারে না, তাই অনেক বিষয়েই আছে, যা অব্যক্ত থেকে যায়। সেখানে হরিণের মৃত্যুর পেছনে অনেক সময় মানুষ নামের স্বার্থান্ধ গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে থাকে। বনের বড় বড় গাছ পূজার করার জন্য দুষ্কৃতকারীরা তৎপরতা চালিয়ে থাকে। প্রাণীবৈচিত্রের ধ্বংস সাধন করে সুন্দরবনকে যারা নিঃস্ব করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সুন্দরবনের বৃক্ষ, জীবজন্তু অভিযোগ না করতে পারলেও মূল দায়িত্ব আমাদের ওপরই বর্তায়। এজন্য অরণ্যের ‘না বলা কথা’ জেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আমারও ইচ্ছা জাগে।
অরণ্যের উদারতা : সৌন্দর্য দিয়েই শুধু অরণ্য আমাদের সেবা করছে, তা নয়। অনেক বিরল সম্পদ দান করেও আমাদের সমৃদ্ধ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে সুন্দরবন মায়ের মতো দেশকে আগলে রাখে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে সুন্দরবনের মতো অরণ্য। তাই অরণ্যের উদারতা থেকে আমাদেরও শিক্ষনীয় আছে। সুন্দরবনে গিয়ে আমার এরূপ উপলব্ধি হয়েছিল। আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলাম সেদিন অরণ্যের উদারতা। বৃক্ষের বিশাল সম্ভার থেকেই অরণ্য। আর গাছ আমাদের পরম বন্ধুর মতো। গাছের সৃষ্টির আদিকাল থেকে এখনো বিরাজমান।
ভ্রমণের শেষ মুহূর্তে : বনের ভেতর থেকে ফেরার পথে মা-বাবাকে একসাথে পেয়ে খুশি হলাম। তারা আমার উপর কিছুটা আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাই আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু ফেরার আগে একটা ঘটনা আমাকে ভীষণ মর্মাহত করেছিল।
বন থেকে ফিরতে গিয়ে দেখি কয়েকজন বন্দুকধারী মানুষ। তারা মুখোশ পরা ছিল। আমি তো দেখে ভীত হয়ে গেলাম। আমার সঙ্গে কেউ না থাকায় খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু তারা আমাকে দেখতে পেল না।আমি চুপ করে সবকিছু দেখতে থাকলাম। তারা আরো দূরে যেতে থাকলো। আমি সাহস পেয়ে হাটা শুরু করলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে কয়েকবার গুলির প্রচন্ড আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি সেখানে আর না থেকে দ্রুত বের হতে থাকলাম। তারপরেই মা-বাবার সঙ্গে দেখা। পরে তাদের বিস্তারিত খুলে বললাম।
অরণ্যের ছোঁয়ায় : সাগরের বিশালতা, আকাশের ব্যাপ্তি যেমন মানুষের মনকে বড় হতে শেখায়, তেমনি নিবিড় অরণ্যে একা ঘুরে আমি সেই শিক্ষাই পেয়েছি। অনেক মুনি-ঋষি অরণ্যের উদারতা নিয়েই হয়তো সাধক হয়েছিলেন। তাই অরণ্যই ছিল তাদের ধ্যানের ক্ষেত্র। ধ্যানী হতে না পারলেও অনন্ত একজন জ্ঞানীপিপাসু মানুষ হিসেবে অরন্যের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। একই সঙ্গে ভয়, আতঙ্ক, আনন্দ, মুগ্ধতার এক বৈচিত্র ভরা অনুভূতি আমার মনকে নতুন করে আবিষ্কার করল। তাই কবির মতো আমার মনও গাইতে চাই –
“ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি। বনের পথে যেতে
ফুলের গন্ধে চমক লেগে। উঠেছে মন মেতে
বিস্ময় তাই জাগে, জাগে আমার গান।”
………………..……………….……….
“জানার মাঝে অজানার করেছি সন্ধান।”
উপসংহার : বাংলার রূপ-রসের ভান্ডার হলো অরণ্য। সেই অরণ্যের মধ্যে নিবিড়তায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারার মাঝে রয়েছে গভীর আনন্দ। সেদিন সুন্দরবনের নিবিড় সান্নিধ্যে আমি এই সত্যই উপলব্ধি করেছিলাম। আমার জীবনের স্মৃতিতে সেই দিনের নিবিড় অরণ্যে একাকী ভ্রমণের ঘটনা চির অক্ষয় ও ওমর হয়ে থাকবে। কেননা, জন কিটস্ বলেছেন–
“A thing of beauty is joy forever”