ভূমিকা : প্রতিভা মানুষের সৃজনশীলতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখে। একাগ্র, ইচ্ছাশক্তি,পরিশ্রম ইত্যাদি সম্মিলনে মানুষের মাঝে প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। যাদের মাঝে প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে তারা সমাজকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ দান করে যান। আর সেই প্রতিভাবানদেরকে যুগে যুগে মানুষেরা স্মরণ করে থাকে। কেননা, তাদেরকে অনুসরণ করার মধ্য দিয়েই পরবর্তী দিনের নতুন প্রতিভার জন্ম হয়।
প্রতিভা : প্রতিভা মানুষের এমন একটি গুণ যা অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে। জগতে বহু প্রতিভাবানের জন্ম হয়েছে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সমাজ পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। কোন মানুষকে কোন মানদন্ডে প্রতিভার অধিকারী বলা হবে, এমন সুনির্দিষ্ট কোনো মতামত নেই। স্থান ও কালভেদে প্রতিভাবানদের সমাদর আলাদা হয়ে থাকে। আজও সভ্যতায় যেকোনো সফলতার মূলে রয়েছে প্রতিভা। একমাত্র প্রতিভাই পারে মানুষের জীবনকে সুন্দর ও উন্নত করতে।
প্রতিভার স্বরূপ : প্রতিভার সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা প্রদান করা কঠিন হয়ে ওঠে। কেননা, প্রতিভাবানরাও প্রতিভার সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন বলেছেন, ‘প্রতিভা হলো একভাগ প্রেরণা আর নিরানব্বই ভাগ কঠিন পরিশ্রম’। ইংরেজ কবি লং ফেলো বলেছেন, ‘প্রতিভা অসীম পরিশ্রম’। মানুষের জীবনের সাফল্যের মূলে রয়েছে প্রতিভা। কিন্তু মানুষের মাঝে যে প্রতিভার সম্ভাবনা থাকে তা উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয় না। এই বিষয়ে ইরাসমাস বলেছেন, ‘লুকোনো প্রতিভা কোনো সুনামই অর্জন করতে পারে না’। প্রতিভাবানরা কোন নির্দিষ্ট গণ্ডির মাঝে নিজেদেরকে আবদ্ধ রাখতে চান না। তারা অপরদের তুলনায় ব্যতিক্রমধর্মী হয়ে থাকেন। প্রতিভা সম্পর্কে অনেকের ধারণা যে,তা প্রকৃতির দান। আবার অনেকে মনে করেন যে, প্রতিভা সৃষ্টিকর্তার দান। এমন নানা চিন্তার ফলে প্রতিভা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে না। এজন্য প্রতিভাবান ও মনীষীদের জীবন অনুসরণ করেই আমরা প্রতিভা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে পারি।
প্রতিভা রহস্য : প্রতিভাবানদের জীবনাচরণ বেশিরভাগ মানুষের কাছেই রহস্যময় মনে হয়। জীবনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে যারা অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যান তাদের জীবন মানুষের কাছে রহস্যপূর্ণ হওয়াটা স্বাভাবিক। সমাজ ও জীবনকে নির্মোহভাবে উপভোগ করার মধ্য দিয়ে পৃথিবীকে নতুন নতুন সৃষ্টি উপহার দেওয়ার মাঝেই তাঁরা সত্যিকারের আনন্দ খুঁজে পান। এই প্রতিভার রহস্যময়তা সম্পর্কে পিথাগে বলেছেন—
‘প্রতিভাবান ব্যক্তি যদি কিছুটা রহস্যময় চরিত্রের হয়
তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’
প্রতিভা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা : প্রতিভা সম্পর্কে অনেক মতামত থাকলেও মূলত তা প্রতিভা সম্পর্কিত ধারণাকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু সমাজে প্রতিভা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণাও প্রচলিত আছে। প্রতিভা নাকি জন্মগতভাবেই মানুষ পেয়ে থাকে। আবার বিশ্বাস করা হয় যে, মানুষের প্রতিভা হলো সৃষ্টিকর্তার দান। কিন্তু প্রতিভা কোন অলৌকিক শক্তি ও নয় এবং জন্মে সূত্রে পাওয়া ক্ষমতাও নয়। এ সম্পর্কে ভলতেয়ার বলেছেন, ‘প্রতিভা বলে কোন জিনিস নেই। পরিশ্রম কর, সাধনা কর, প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে।’ জগতে যারা প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, প্রতিভা সম্পর্কে তাদের মনে কি ধারণা ছিল, তা তলিয়ে না দেখে মানুষ বাইরে থেকে ভ্রান্ত অলৌকিকতা আরোপ করে।
প্রতিভার মূলমন্ত্র : মানুষ প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, তাই প্রতিভা মূলত অর্জন করতে হয়। প্রতিভা অর্জন করার প্রধান শর্তই হলো পরিশ্রম ও নিষ্ঠা। কেউ যদি নানা গুণের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তা কখনো চর্চা না করে তবে তার যেমন বিকাশ ঘটে না, তেমনি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ধৈর্যের সাথে পরিশ্রম না করলে কোনদিন প্রতিভার দেখা মেলে না। তাই বলা যায় প্রতিটি মানুষ সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু সেই প্রতিভার জাগরণ ঘটানোটাই বড় বিষয়। মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও ছোটবেলায় পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। কিন্তু গণিত ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে তাঁর একাগ্র সাধনা ও মগ্নতাই তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবানদের তালিকায় তুলে এনেছে। প্রতিভাবান হতে হলে চাই ত্যাগ অধ্যাবসায় ও ধৈর্য।
প্রতিভার বিকাশ : যে কুঁড়ি প্রস্ফুটিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে তার যেমন নির্দিষ্ট পরিচর্যার দরকার, তেমনি মানুষের প্রতিভার বিকাশেও সচেতন তাগিদ দরকার। কেননা, অযত্নের ফলে অনেক প্রতিভা অকালেই ঝরে যায়। কথায় আছে, ‘যত্ন ছাড়া রত্ন মেলে না’। তাই প্রতিভাকে জন্মসূত্রে পাওয়া অথবা প্রকৃতির দান মনে না করে সঠিক পরিচর্যা ও যত্নের মাধ্যমে বিকশিত করতে হবে। তাহলেই সমাজে প্রতিভাবানদের অবদান রাখার সীমাহীন ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।
প্রতিভার বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ : প্রতিভা বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের প্রয়োজন রয়েছে। বাহ্যিক পরিবেশই শুধু নয়, মানসিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রতিভা বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানে যার গবেষণা করার অধিক আগ্রহ তাকে যদি সেই রকম পরিবেশ দেওয়া না হয় তবে তার দ্বারা নতুন অবদান রাখা অসম্ভব। কিন্তু সব সময় অনুকূল পরিবেশ পেয়েই মনীষীগণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তেমনটি নয়। অনেক প্রতিকূল পরিবেশকে অতিক্রম করে তাদেরকে এগিয়ে যেতে হয়েছে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে।
প্রতিভা বিকাশের সমাজের ভূমিকা : প্রতিভাবানরা সব সময় নতুন নতুন ভাবনার পক্ষে ও কল্যাণের পথে থাকে। নতুন চিন্তার ও সৃষ্টির পথে চলতে গিয়ে অনেক সময় সমাজের প্রচলিত ধারণা তাঁদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। তবুও সমাজের কল্যাণের নিমিত্তে প্রতিভাবানরা লক্ষ্য অর্জনে একনিষ্ঠ থাকেন। মানুষের অবহেলা চরম অসহযোগিতার বিপরীতেও প্রতিভাবানরা সামনে এগিয়ে যান।
অনুস্মরণীয় প্রতিভার দৃষ্টান্ত : বর্তমান পৃথিবীর অবস্থা যেমন দেখছি, অতীতে তেমন ছিল না। প্রতিভাবান মানুষদের জাদুময়ই হাতের ছোঁয়ায় মানব সভ্যতার ক্রম রূপান্তর ঘটেছে। বর্তমান পৃথিবীর যে বিজ্ঞানের জয় জয়ীকার সেই বিজ্ঞানের ইতিহাসে রয়েছে মহান ব্যক্তিদের অসামান্য প্রতিভার স্বীকৃতি। গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, নিউটন, এডিসন, ডারউইন, চার্লস ব্যাবেজ ইত্যাদি বিজ্ঞানীগণ আজও অনুসরণীয় হয়ে আছেন। এদেশের বিজ্ঞানীদের মধ্যে জগদীশচন্দ্র বসু,সত্যেন্দ্র নাথ বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ও ভারত উপমহাদেশের প্রতিভাবান ব্যক্তিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, এস এম সুলতান, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখের নাম ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। দেশ, জাতি ও পৃথিবীর কল্যাণে নিজেদের প্রতিভার প্রয়োগ ঘটিয়ে এই মনীশীগণ আমাদের কাছে হয়ে আছেন অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় জীবন পথের দিশারী।
উপসংহার : মানব সভ্যতার বিকাশের মূলেই রয়েছে নিরন্তন শ্রম সাধনা ও প্রতিভার স্বাক্ষর। একটি মানুষের শৈশব থেকে যেই সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে তা উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে পৌঁছাতে পারে এর সাথে সমাজও উন্নতির দিকে ধাবিত হয়। আমরা যে পরিবেশে বাস করছি সেখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে এমন প্রতিভা। এদের যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমেই জাতি ধাবিত হবে নবদিগন্তের দিকে। এই প্রতিভা যেন খারাপ কাজে ব্যবহার না হয় সেটাও আমাদের সকলের লক্ষ রাখতে হবে। তাই প্রতিভা বিকশিত হওয়ার জন্য যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টিতে আমাদের সকলকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।
অন্যান্য রচনা
একুশে বইমেলা
পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য
সত্যবাদিতা