ভূমিকা : মহৎ প্রতিভার আবির্ভাব সমগ্র দেশ ও জাতির জীবনে এক কাঙ্খিত ও স্মরণীয় মুহূর্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনই এক বিস্ময়কর প্রতিভা যিনি খন্ডকালের হয়েও সর্বকালের। তিনি শুধু ভাষাসাধক নন, নন কবিশ্রেষ্ঠ– তিনি চিন্তাবিদ, দার্শনিক। রবীন্দ্রনাথ আমাদের অহংকার, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের সমৃদ্ধি।
শৈশব ও কৈশোর : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতা-মাতার চতুর্দশ সন্তান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাক্ষ আদি ধর্ম মতবাদের প্রবক্তা। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষেরা খুলনা জেলার রুপসা উপজেলা পিঠাভোগে বসবাস করতেন। শৈশবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনার, বেঙ্গল একাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন। ছোটবেলায় তিঁনি জোড়াসাঁকোর বাড়িতে কিংবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি স্বচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
যৌবনে রবীন্দ্রনাথ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যারিস্টার পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যান। ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে সে পড়াশোনা তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। যৌবন বয়সে তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘মানসী’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছের প্রথম ৮৪ টি গল্পের প্রায় অর্ধেকই যৌবন বয়সে লিখিত। এসব ছোটগল্পে তিনি বাংলার গ্রামীণ জনজীবনের আবেগময় ও বাস্তব চিত্র এঁকেছিলেন।
বিবাহ : ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ঠাকুরবাড়ির কর্মচারী বেণীমাধব রায় চৌধুরী কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ হয়েছিল মৃণালিনী দেবী। রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনীর সন্তান ছিল পাঁচজন। মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেনুকা, মীরা ও শমীন্দ্রনাথ। তবে এদের মধ্যে অল্প বয়সেই রেনুকা ও শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়।
ভ্রমণপিপাসু রবীন্দ্রনাথ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট ১২ বার বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। তিনি ১৯৭৮ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে পাঁচটি মহাদেশের ৩০ টির বেশি দেশ ভ্রমণ করেন। ১৯১২ সালে ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে ইয়েটসসহ কয়েকজন কবি ও বুদ্ধিজীবীকে সদ্যরচিত ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ পাঠ করে শোনান। ইয়েটস স্বয়ং নিজে উক্ত কাব্যের ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকাটি লিখে দিয়েছিলেন। ১৯২৪ সালের দিকে তিনি চীন সফরে যান। চীন থেকে জাপানে গিয়ে জাতীয়বাদ বিরোধী বক্তৃতা দেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, ইরাক, পারস্য ইত্যাদি দেশ ভ্রমণ করেন।
সাহিত্যচর্চা : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শৈশব থেকে তার মাঝে সাহিত্যচর্চার ভাব লক্ষ্য করা যায়। মহাকাব্য ব্যতীত সাহিত্যের প্রত্যেক শাখায় তাঁর হাতের স্বর্ণস্পর্শ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন দিক নিম্নে আলোচনা করা হলো –
কবিতা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন সুনামধন্য কবি। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কাব্য রচনা শুরু করেন। তাঁর প্রকাশিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫২। এছাড়া তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মানুসী’ ‘সোনার তরী’ ‘চিত্রা’ ‘গীতাঞ্জলি’ ‘বলাকা’ ‘ক্ষণিকা’ ‘জন্মদিনে’ ‘শেষলেখা’ প্রভৃতি।
উপন্যাস : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট ১২ টি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। এই উপন্যাসগুলোতে মূলত তিনি সামাজিক, মানসিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস গুলো হলো ‘চোখের বালি’ ‘গোরা’ ‘ঘরে বাইরে’ ‘শেষের কবিতা, প্রভৃতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ ও ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’।
প্রবন্ধ ও পত্রসাহিত্য : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় একাধিক সংখ্যক প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। এ সকল প্রবন্ধে তিনি সমাজ, রাষ্ট্রনীতি, ধর্ম, সাহিত্যতত্ত্ব, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, ছন্দ, সংগীত ইত্যাদি নানা বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা জন্মদিনের অভিবাসন ‘সভ্যতার সংকট’ তাঁর সর্বশেষ প্রবন্ধগ্রন্থ।
নাট্য সাহিত্য : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে ছিলেন নাট্যকার নাট্যাভিনেতা। জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির পারিবারিক নাট্যমঞ্চে মাত্র ১৬ বছর বয়সে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘হঠাৎ নবাব’ নাটকে ও পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই ‘আলীকবাবু’ নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৮১ সালে তার প্রথম গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ মঞ্চস্থ হয়। মূলত এই নাটকের তিনি ঋষি বাল্মীকির ভূমিকার অভিনয় করেছিলেন।
সংগীত ও নৃত্যকলা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট ১৯১৫ টি গান রচনা করেছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর লেখা বহু কবিতাকে গানে রূপান্তরিত করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে বাংলার শিক্ষিত পরিবারে নৃত্যের চর্চা বারণ ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর পাঠক্রমে সংগীত ও চিত্রকলার সাথে সাথে নৃত্যকেও অন্তর্ভুক্ত করেন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোকনৃত্য ও ধ্রুপদি নৃত্যশৈলী গুলোর সংমিশ্রে তিনি এক নতুন শৈলীর প্রবর্তন করেন। এই শৈলীটি রবীন্দ্রনৃত্য নামে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যগুলোতে গানের পাশাপাশি নাচও অপরিহার্য।
চিত্রকলা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সত্তর বছর বয়সে নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন। চিত্রাঙ্গনে তাঁর কোন প্রথাগত শিক্ষা ছিল না। তার অঙ্কিত স্কেচ ও ছবিগুলো শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে। পেশাদার চিত্রশিল্পীর মতো তাঁর ছবি নিয়ে বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনী হয়েছে। সর্বোপরি তিনি একজন ভালো চিত্রশিল্পী ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক মতাদর্শ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনৈতিক দর্শন অত্যন্ত জটিল। তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন করতেন।
শিক্ষাবিস্তার : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী। তিনি ‘শান্তিনিকেতন’ নামে একটি বিদ্যাপীঠ স্থাপন করেন। নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন এই বিদ্যালয়ের পরিচালনা খাতে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও শান্তিনিকেতনে অধ্যক্ষ ও শিক্ষক হিসেবে ব্যস্ত থাকতেন। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে বিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে তিনি একাধিকবার ইউরোপ ও আমেরিকায় ভ্রমণ করেন।
মৃত্যু : ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ ( ইং ৭ আগস্ট ১৯৪১) ঘনঘোর বাদল দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইহলোক ছেড়ে মহাপ্রণায়ণের পথে চলে গেলেন। কিন্তু দেশ ও জাতির কাছে রেখে গেলেন অফুরান ঐশ্বর্যভান্ডার।
উপসংহার : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন মহাকবি বাল্মীকি, বেদব্যাস ও কালিদাসের সার্থক উত্তরসূরি। তিনি ছিলেন মনুষ্যত্বের সাধক। সুন্দরের আরাধনা করতে গিয়ে তিনি মানবতাকে বিসর্জন দেননি। তার মহিমায় বাংলা সাহিত্য পরিপূর্ণতা পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে আমাদেরকে রবীন্দ্রচর্চা করতে হবে। তাই সকলের উচিত কোনো বিতর্কে না জড়িয়ে শুদ্ধভাবে রবীন্দ্রচর্চা করা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা PDF Format
অন্যান্য রচনা
আমার জীবনের লক্ষ্য
প্রতিভা রচনা
যৌন নিপীড়ন : এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি