sampradayik sompriti rochona

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি 

অথবা, বিশ্বশান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকা

ভূমিকা : সারা বিশ্বে এখন নাস্তিকদের তুলনায় আস্তিক লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। এই আস্তিক লোকের মধ্যে রয়েছে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি ধর্মসহ নানা ধর্মের বিশ্বাসী মানুষ। ঐতিহাসিক পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশ ইসলাম, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্মাবলম্বী মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক গীতিময় ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বসবাস হলেও স্বীয় অস্তিত্ব এবং মান-সম্মান নিয়ে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষও এখানে ধর্ম পালন করছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ধর্মীয় বাতাবরণকে পাশ কাটিয়ে জাতীয় চেতনা এবং শান্তির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রত্যেকেই সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জীবনযাপন করছে। এ সৌহার্দের ঐতিহ্যগত সহমর্মিতা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সব সময় বাড়াবাড়ির পথ থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় রীতি এদেশের প্রত্যেকটি ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে থাকলেও ধর্মান্ধতার বিষাক্ত ছোবল এ সমাজকে কখনো আক্রান্ত করতে পারেনি। 

বাংলাদেশের ধর্ম : বাংলাদেশের এ ধর্মীয় ইতিহাস অনেক পুরাতন। বহুদিনের ইতিহাসের ধারায় এখানে নানা ধরনের শাসকগোষ্ঠী যেমন শাসন করেছে, তেমনি বিকাশ লাভ করেছে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি আর বিশ্বাস। এজন্য বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এখনো হিন্দু, বৌদ্ধ, ইংরেজ এবং মুসলিম শাসকদের নানা কীর্তি চোখে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৯০% লোক মুসলমান। দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পূর্বে যে পরিমাণ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা এদেশে বসবাস করত তা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে। যারা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে স্থায়ী হয়। মূলত এর পিছনে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণ জড়িত। অন্যদিকে ব্রিটিশ শাসনামল এবং পরবর্তীকালে এনজিও কার্যক্রমের নামে খ্রিষ্টান মিশনারীদের ব্যাপক তৎপরতায় এদেশের খ্রিষ্টানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জায়গায় যে সকল উপজাতি রয়েছে তাদের অধিকাংশই বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান। তবে তাদের অনেকেরই আবার নিজস্ব ধর্ম রয়েছে। 

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বাংলাদেশ : বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অন্যতম উদাহরণ। সাম্প্রতিককালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেও প্রকিতার্থে দু-দিক থেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কেউ যদি সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করে থাকে তবে তা যেমন সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিকদের নোংরামির ফল, তেমনি যারা এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় করছে সেটাও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কৌশল। কারণ এদেশের সাধারণ জনগণের স্বাভাবিক প্রবণতায় এমন আচরণ অনুপস্থিত। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, এদেশের নানা ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে। পাকিস্তানের শাসকরা যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে বাঙালি জাতিকে শোষণ করেছিল, তখন এদেশের মানুষ সে শুভংকরের ফাঁকি  ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। ফলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শোষকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে এদেশকে মুক্ত করেছিল। বর্তমানে এদেশের মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বহুকাল আগে থেকেই এখানে হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। বাংলার আনাচে কানাচে পাশাপাশি বাড়িতে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান বসবাস করছে। 

বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম আরেকটি গুণ হলো, এখানে হিন্দু মুসলমানের বাইরে প্রতিবেশী ও সমাজের সদস্য হিসেবে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে তারা অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। এখানে প্রত্যেকটি ধর্মের মানুষ তাদের নিজস্ব ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করে এবং একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রীতিনীতি প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। তাছাড়া পহেলা বৈশাখ, পিঠাপুলির উৎসবসহ এমন কিছু উৎসব রয়েছে যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি এক অভিন্ন অস্তিত্বের সন্ধান খোঁজে। 

অপরের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং প্রত্যেককে তাদের ধর্মকর্ম পালনের সুযোগদানের ব্যাপারে এদেশের সকল মানুষ সজাগ। প্রত্যেকটি মসজিদে আযানের পবিত্র ধ্বনির আবহ যেমন মানব মনকে মুগ্ধ করে, তেমনি মন্দির চর্চা কিংবা প্যাগোডায় বিনীত প্রার্থনার আকুলতা ও পবিত্র আবহ ছড়ায়। 

মুসলমানদের আচার অনুষ্ঠান ও দৃষ্টিভঙ্গি : বাংলাদেশ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের দেশ হলেও মূলত মুসলিম জনগোষ্ঠীর আচার অনুষ্ঠান জাতীয় জীবনে প্রধান। কেননা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম এ মুসলিম দেশটিতে প্রায় ১১ কোটি মুসলমানের বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানরাও পৃথিবীর অন্য দশটি মুসলিমদেশের মতো সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নবান। কিন্তু ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি অথবা উগ্রতা এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের স্বাভাবিক চেতনায় অনুপস্থিত। ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেও এদেশের মুসলমানেরা তাদের এ বিশ্বাসকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী নয়। 

এছাড়া বাংলাদেশের মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় কার্যকলাপ এবং আনুষ্ঠানিকতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও তা তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে না। বরং সকলে যার যার মত ও পথ অনুযায়ী ধর্মীয় অনুশাসনের অনুসরণ করে থাকে। ধর্ম এদেশের সহজ সরল মানুষের মাঝে উগ্রতা কিংবা বিচ্ছিন্নতা নয়, ভ্রাতৃত্ব আর সোহার্দের শিক্ষাই দিয়েছে। মুসলমানদের ঈদ বা অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সকলের মিলন মেলায় পরিণত হয় যা সবাইকে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে। এদেশের মুসলমানদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের উপর যে নির্যাতন এবং  নিপীড়ন হচ্ছে তার বিরোধী হলেও তাদের প্রতিক্রিয়া অবশ্যই শান্তিপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের গুজরাটে মুসলমানদের উপর যে নির্যাতন চালানো হয় তার প্রতিক্রিয়ায় এদেশের হিন্দুদের কোন ক্ষতি এদেশের মুসলমানরা করেনি। বরং এদেশের হিন্দুরাও এ বর্বরতার নিন্দা প্রকাশ করেছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের দুর্দশা লাঘবের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করাকে এদেশের মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করে। পাশাপাশি সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে এদেশের মানুষ বরাবরই ঘৃণা করে এসেছে। এজন্য ধর্মীয় উগ্রতা কিংবা ধর্মানন্ধতা নয় বরং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি ঐকান্তিকতা আর অনুসরণে দুনিয়া-আখিরাতে মুক্তির একমাত্র রাস্তা হিসেবে ধরে নেওয়াই এদেশের মানুষের বৈশিষ্ট্য।  

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম : বাংলাদেশের রাজনীতি ধর্ম দ্বারা পরিচালিত হয় এমন কথা পর্যন্ত থাকলোও সেটা সত্য নয়। ধর্মের নামে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাকে এদেশের জনগণ ঘৃণা করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে হেয়প্রতিপন্ন করা হলে বা যেকোন ধরনের ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ডকে এদেশের জনগণ কখনো সমর্থন করেনি। বিপরীত পক্ষে পুরোপুরি ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠার যে আদর্শিক আন্দোলন তার প্রতিও জনসাধারণের সমর্থন তেমনভাবে লক্ষ্য করা যায় না। বরং এদেশের মানুষ মধ্যপন্থা অবলম্বনে বিশ্বাসী। এজন্য দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামের মত ধর্মভিত্তিক দল এককভাবে যেমন সুবিধা করতে পারেনি, তেমনি বামপন্থী দলগুলোর অবস্থাও করুন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মতো দলগুলো যখন ধর্মের প্রতি তাদের সহানুভূতি তুলে ধরতে পেরেছে তখন ভোটারদের সহানুভূতি পেয়েছে। এছাড়া এদেশের আলেম-ওলামা ও পীর মাশায়েখদের একটি বিরাট অংশ সরাসরি কোনো দলের সমর্থন করে না। মূলত তারা মানুষকে ধর্ম-কর্মের শিক্ষাদান এবং এ সকল ব্যাপারে সজাগ করে তোলাকেই মূল দায়িত্ব মনে করেন। ফলে এদেশের কোনো উগ্রবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উপস্থিতির কথা শুধুই কাল্পনিক। তাই একবার এক কমিউনিস্ট নেতা বলেছিলেন – ‘বিকেল বেলায় আমি যখন সমাজতন্ত্রের উপর বক্তৃতা দেই তখন প্রচুর লোক জড়ো হয়, কিন্তু যখন মাগরিবের আজান হয় তখন মুসলমানরা মসজিদে আর হিন্দুরা মন্দিরে চলে যায়।’

উপসংহার : নানা ধরনের অপপ্রচার ও অপতৎপরতা সত্ত্বেও নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশ কোনো অর্থেই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নয়। এদেশের মানুষের বহুদিনের যে সাংস্কৃতিক উপাদান ও ধর্মীয় ঐতিহ্য তা কখনোই ধর্মীয় বাড়াবাড়িকে প্রশ্রয় দেয়নি। বরং আদিকাল থেকে এখানে নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ পাশাপাশি বাস করে আসছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চর্চার সর্বজনীনতা দেখলে বলা যায়, এখানকার মানুষ প্রথমেই তাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এদেশে মসজিদ, মন্দির ও মানুষের ধর্ম-কর্ম পালন কোনমতেই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। 

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রচনা PDF Format

 

অন্যান্য রচনা
ছাত্র জীবন
সমাজ জীবনে দুর্নীতি
কর্মমুখী শিক্ষা

Facebook
Pinterest
Reddit