অথবা, আমাদের রাজনীতি ও ছাত্রসমাজ
অথবা, ছাত্রসমাজের প্রত্যক্ষ রাজনীতি করার ভালো মন্দ দিক
অথবা, ছাত্র সমাজের রাজনীতি করার অধিকার
ভূমিকা : শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। এজন্য জাতির মেরুদন্ডকে সোজা করার জন্য বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাজ তপস্যায় রত। কিন্তু রাজনীতির সাথে জড়িয়ে আজ গোটা ছাত্রসমাজই কলুষিত হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও ছাত্র উভয়ই বর্তমানে লেখাপড়া শেখানো ও শেখা থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছে। তাদের কাছে এখন শিক্ষার চেয়ে জাতীয় রাজনীতির লেজুরবৃত্তি করা ও নিজ স্বার্থ আদায় করা প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান ছাত্ররা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে জাতির সামনে এক ঘোর অমানিশা বিরাজ করছে।
ছাত্র সমাজের মূল লক্ষ্য : ছাত্রসমাজের মূল লক্ষ্য হলো নিজেদের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব বহনের উপযোগী করে গড়ে তোলা এবং সে উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান সংগ্রহ করা। এজন্য অধ্যবসায়ের মাধ্যমে লেখাপড়া করতে হবে। নিজে শিক্ষিত না হতে পারলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবনে শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার দিকনির্দেশনা দেওয়া অসম্ভব।
জীবনগঠন : জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ছাত্র সমাজের আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে জীবনগঠনের কঠোর সাধনা। এ ধারণা থেকে বিচ্যুত হলে ছাত্র জীবনের উদ্দেশ্য বিফল হতে পারে। জীবন সুগঠিত না হলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবনে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
চরিত্রগঠন : ছাত্রজীবনই চরিত্র গঠনের মূল সময়। তাই ছাত্রসমাজকে এক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। নিজে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হলে রাজনৈতিক জীবনে সফলতা লাভ করা সম্ভব।
ছাত্রসমাজ ও রাজনীতি : আজকের ছাত্ররাই অদূর ভবিষ্যতে দেশের কান্ডারী। এরাই একসময় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে। তাই ছাত্রজীবন যেমন সফলভাবে গড়তে হবে,তেমনি রাজনীতি সম্পর্কেও ধারণা থাকতে হবে। কারণ রাজনৈতিক ধারণা না থাকলে দেশ চালানো অসম্ভব। এদিক থেকে ছাত্রসমাজ ও রাজনীতির সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ছাত্র রাজনীতি কী : ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে যদি আমরা এক কথায় বলতে চাই, এটি হলো ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত রাজনীতি। অধ্যয়নের পাশাপাশি ছাত্রদের স্বার্থ সংরক্ষণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষার মান বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকরণ, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো ও শিক্ষা শেষে উপযুক্ত কর্মের জন্য সংগ্রামই ছাত্র রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমানে ছাত্রসমাজ অস্ত্রের লড়াইয়ে জড়িত, জাতীয় নেতাদের খুশি করতে ব্যস্ত। এজন্য ছাত্র রাজনীতি এখন কলুষিত, এক সময়ে জননন্দিত ছাত্র রাজনীতি আজ ভয়ানক নিন্দিত। আর এর মূলে কাজ করেছে ছাত্রদের মাঝে সঞ্চারিত হতাশা, বেকারত্ব, জাতীয় রাজনীতিবিদদের নিঃস্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার করার প্রবণতা। এছাড়া অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা, ন্যায় বিচারের অভাব ছাত্র সমাজকে এ লক্ষ্যে নিয়োজিত করেছে।
ছাত্র রাজনীতির পক্ষে : যাঁরা ছাত্র রাজনীতিকে সমর্থন করেন তাদের মতামত হলো, ছাত্ররা দেশের সবচেয়ে প্রগতিশীল অংশ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, জাতির দুঃসময়ে তাদের অবদান, সর্বোপরি জাতির আশা ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে তাদের কর্তব্য নিষ্ঠার ফলে সকল দেশেই ছাত্র রাজনীতি নন্দিত। আজকের ছাত্ররা আগামী দিনের জাতির আশা ও আকাঙ্কার বাহক। ভবিষ্যতে যারা দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতন নাগরিক হয়ে সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালক হবে তারা দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলী থেকে দূরে থাকবে, তা তো হবার নয়। এছাড়া প্রগতিশীলদের ধারণা, শুধু শিক্ষা নয় শিক্ষার যথার্থতা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ছাত্রদের শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের মতো অশিক্ষিতের দেশে ছাত্ররা জাতির উল্লেখযোগ্য সচেতন অংশ। ছাত্রজীবন জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত অংশ। তবে সুস্থ ও স্বাভাবিক ছাত্র রাজনীতি জাতীয় সমৃদ্ধিতে গতি সঞ্চার করতে সক্ষম।
ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় ঐতিহ্য : দেশের রাজনীতিতে ছাত্র রাজনীতির এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ছাত্র রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি পাকিস্তানি শাসনামল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা-আন্দোলন,ঊনসত্তরের এর গণ-আন্দোলন, একাত্তরের স্বাধীনতা-সংগ্রাম, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যের পিছনে ছাত্রসমাজের অপরিসীম ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাই ছাত্র রাজনীতি আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত।
ছাত্র রাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাব : ভবিষ্যৎ জীবনের সুখসমৃদ্ধ ও সফলতা অর্জনের উপযুক্ত সময় হচ্ছে ছাত্রজীবন। এ সময় হলো জীবনের প্রস্তুতিপর্বের কাল। তাই এ সময়ে যদি কেউ ফাঁকি দেয় এবং অবহেলা করে সময় কাটায় তবে বাকি জীবনটা তাকে অসহনীয় কষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়। রাজনীতির মতো কঠিন বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় এটি নয়। আদর্শভ্রষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থসিদ্ধির শিকার হয় তারা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় নেমে আসে চরম বিপর্যয়। বর্তমান আমাদের দেশে ছাত্র রাজনীতি বলে কিছু নেই, যেটুকু আছে তাহল কতিপয় তল্পিবাহক জাতীয় নেতাদের পদলেহন। তাদের চেয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীরাই নিয়ন্ত্রণ করছে বর্তমান ছাত্র রাজনীতিকে। ছাত্ররা ভুলতে বসেছে তাদের শিক্ষা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। নেতা হওয়ার স্বপ্ন তাদেরকে তদ্রাচ্ছন্ন করে, সাধারণ ছাত্রদের কোনো আগ্রহ নেই ছাত্র রাজনীতি নিয়ে। বর্তমান ছাত্ররা অধ্যায়নের পরিবর্তে সমাবেশ মিছিলে সময় নষ্ট করে বেশি। এছাড়া ছাত্রদের মাঝে বিরাজিত হতাশা জাতির অগ্রগতির চাকাকে থামিয়ে দিয়েছে।
ছাত্র রাজনীতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট : ছাত্ররা আজ নিজেদের লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতি নিয়ে বেশি মাথা ঘামাচ্ছে। যার ফলে তাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবমান। রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ছাত্ররা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি কায়েম করছে। চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল ও পাল্টা দখলের ঘটনা। বুলেটের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে তাদের হাতের কলম এখন নির্বাসিত। আবার কিছু সময় দেখা যায় একই রাজনৈতিক দলের দু’ গ্রুপে শুরু হয়েছে বন্দুকযুদ্ধ। ক্ষমতার ভাগাভাগিতে শিক্ষাজীবন আজ বিপর্যস্ত, বিশ্ববিদ্যালয় গুলো বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকবে। এজন্য বাড়ছে সেশনজট, দিশেহারা অভিভাবকমহল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এ খেলা চলবে অনন্তকাল আর ক্যাম্পাসগুলো পরিণত হবে মিনি ক্যান্টনমেন্টে। রাজনীতির এ মারপ্যাঁচে পড়ে এবং রাজনৈতিক দলের লেজোর বৃত্তির ফলে জাতি সর্বনাশের দিকে ধাবিত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে আজ ভীতির রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এটি নিয়ে কোন মহলের কোন উদ্বেগ লক্ষ্য করা যায় না। তাই জাতি আজ এ ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাই।
ছাত্র সমাজের কর্তব্য : বর্তমানের এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে ছাত্রদেরকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধনে। এটি অনুধাবন করতে হবে, সক্রিয় অংশগ্রহণ আর রাজনৈতিক সচেতনতা এক কথা নয়। ছাত্র আন্দোলনের অতীত গৌরব আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে, ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের মাঝে যে সচেতনতার জন্ম দিয়েছিল তার পূর্ণর্জাগরণ ঘটাতে হবে। পাঠ্য বইয়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ধারণাকে সুসংহত করার জন্য নানা ধরনের বই পড়তে হবে। কেননা রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাত্রদের জন্য তখনই সার্থক হবে, যখন থাকবে প্রস্তুতির অনুশীলন। বন্ধ করতে হবে অস্ত্রের ঝনঝনানি। চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। আর সকলকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ছাত্রদেরকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নয়, রাজনীতি জানার দিকেই আগ্রহ হতে হবে।
উপসংহার : বর্তমান আমাদের দেশে ছাত্র রাজনীতির নামে যা চলছে তা আসলে রাজনীতি হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে না। ছাত্র রাজনীতির নামে চলছে উদ্ভট ক্ষমতার প্রদর্শনী। এজন্য আমরা এর হাত থেকে পরিত্রাণ চাই, চাই ছাত্রদের সুস্থ বিকাশের ধারাকে অব্যাহত রাখতে।
অন্যান্য রচনা
ছাত্র জীবন
সমাজ জীবনে দুর্নীতি
কর্মমুখী শিক্ষা