ভূমিকা : যে সকল গুন মানব-চরিত্রকে মহিমান্বিত করে ‘সত্যবাদিতা’ তার মধ্যে একটি অন্যতম গুণ। সত্যের চেয়ে আর বড় গুণ নেই। এই পৃথিবী চির সত্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। সত্য ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেকে গড়ে তোলে, মনুষ্যত্বকে অর্জন করে। এজন্য মানুষের সাধনা, সত্যের সাধনা। সত্যবাদীতার গুণ লাভ করাই মানুষের আজীবনের সাধনা হওয়া উচিত। কোন কিছুকে লুকিয়ে না রেখে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার বৈশিষ্ট্যের নামই সত্যবাদিতা।
বৈশিষ্ট্য : কোনো কিছুর যথাযথ প্রকাশকে সত্য বলা বোঝায়। আর সত্যবাদিতার অর্থ আরো ব্যাপক। শুধু ‘মিথ্যা না বলা’ বোঝাতে সত্যবাদিতা বোঝায় না। সত্যকে অবলম্বন করে যে বৈশিষ্ট্য বিকোশিত হয়, সেটাই হলো সত্যবাদিতা। সত্যের মাঝে কোন গোপনীয়তা নেই। সত্যবাদী ব্যক্তির কথা ও কাজের মধ্যে কোন ভেদাভেদ থাকে না। সত্যের মাঝে মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়। সত্যের মধ্য দিয়েই মানুষ সততা অর্জন করে। সততা মানব চরিত্রের একটি মহৎ গুণ। কোন প্রকার পাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে ন্যায় ও সত্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে চরিত্রের বিকাশ ঘটাতে পারলে তাতে সততার পরিচয় ফুটে ওঠে।
শ্রেষ্ঠ গুণ : সত্যবাদিতা মানবজীবনের একটি বিশেষ গুণ। যে সকল গুন জীবনকে সার্থক ও বিশিষ্ট করে তোলে তার মাঝে সত্যবাদীতার স্থান সবার ঊর্ধ্বে। সত্যকে অবলম্বন করলে জীবনে সাফল্য অর্জন সম্ভব। একমাত্র সত্যবাদী ব্যক্তি সমাজে সম্মান ও মর্যাদার আসন লাভ করে। অন্যদিকে, সকল পাপের মূল উৎস হলো মিথ্যা। কেননা, মিথ্যা থেকেই শুরু হয় প্রতারণা, জালিয়াতি ইত্যাদি নানাবিধ কুকর্ম। এজন্য মিথ্যা বলা মহাপাপ। আর সত্যবাদিতা ব্যক্তির শ্রেষ্ঠ গুন।
সত্যবাদিতার সুফল ও প্রয়োজনীয়তা : সত্যবাদীকে সকলেই পছন্দ করে। সমাজে তাঁকে সবাই সম্মান করে এবং ভালোবাসে। অন্যদিকে মিথ্যাবাদীকে কেউ পছন্দ করে না। সমাজে তাকে সবাই ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। সত্যবাদিতা থেকে বিচ্যুত হলে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে যার ফলে সমাজ জীবনে অবৈধ কর্মকান্ড মাথা চড়া দিয়ে ওঠে এবং মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণাবলীর তিরোধান ঘটে। মানুষ তখন নানা অপরাধমূলক কর্মে নিয়োজিত হয়। ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তাই আদর্শ জীবনযাপনের জন্য সত্যবাদিতা অপরিহার্য।
বাস্তব অবস্থা : সত্যবাদিতা বাস্তব জীবনে একটি মহত্তর দিক হলেও দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তা মর্যাদা লাভ করতে পারছে না। সততা পরিহার করে মানুষ সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। ফলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিকে তারা প্রাধান্য দিয়ে লিপ্ত হয়েছে নানা রকমের অন্যায়, অত্যাচার,দুর্নীতি ইত্যাদি নানাবিদ অপকর্মে। অসততার প্রতি মানুষের তেমন প্রতিবাদ দেখা মিলছে না। সততাকে বিসর্জন দিয়ে মানুষ এখন নিজের স্বার্থ সাধনে ব্যস্ত। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় বড়দের থেকে ভালো কিছু শেখা অনিশ্চিত। যুব সমাজকে নতুন চেনায় উদ্দীপ্ত করার মতো কোনো পরিকল্পনা নেই, ফলে তারা প্রতিনিয়ত অবক্ষয়ের দিকে ধাবমান হচ্ছে। বর্তমান সমাজের সর্বস্তরে যে সততা, সত্যবাদিতা ও মূল্যবোধের অভাব, তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া যুবকদের মধ্যে প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে।
কর্তব্য : জীবনকে সত্যবাদীতার মাধুর্যে মহিমান্বিত করতে হবে। অন্যায় কিংবা অবৈধ উপায়ে যতই বিত্তশালী হোক না কেন বিবেকের কাঠগড়ায় সে আজীবন চরম অপরাধী হয়ে থাকবে। অসত্যের পরাজয় ঘটে আর সত্যের পথ চির উজ্জ্বল থাকে। তাই সততা ও সত্যবাদীতার অনুশীলন করতে হবে এবং জীবনে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে মনুষ্যত্বের অধিকারী হতে হবে।
প্রভাব : মহামানবগণ সত্যের পথ অনুসরণ করে তাঁদের জীবনের মহান সাধনাকে সফল করেছে। সত্যবাদিতার জন্য তারা যেমন তাদের লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য লাভ করেছেন, তেমনি সত্যের বলে বলিয়ান হয়ে প্রবল শত্রুকেও তারা পরাজিত করেছে আর নিজেদের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেছেন। সত্যের সাধনায় মহাপুরুষগণ তাদের জীবনকে যেভাবে গৌরবান্বিত করে গেছেন তা মানুষের কাছে মহান আদর্শ হিসেবে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা হয়ে থাকবে।
উপসংহার : সত্যকে যারা মর্যাদা দেয় না, তারা কখনো উদার হতে পারে না, তাদের মনে ভয় বিরাজ করে। সত্যবাদীতার মহৎ গুণের অভাবে মানুষের মন সব সময় ছোট থাকে। অপরদিকে সত্যবাদী মানুষ নির্ভীক হয়, অসীম সাহস তার মনে বাসা বাঁধে। সেজন্য সত্যের পথ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকতে হবে।
অন্যান্য রচনা
শিক্ষামেলা
একুশে বইমেলা
পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য