ভূমিকা : মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি – এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ আমাদের ব্যক্তি, সমাজ তথা জাতীয় জীবনে খুবই তাৎপর্য বহন করে। এই ধরার সুন্দর-সুশীতল স্পর্শ দেওয়ার জন্যই মমতাময়ী মা সন্তানের জন্ম দেয়। মায়ের অকৃত্রিম আদর-স্নেহ ও ভালোবাসায় বেড়ে উঠতে থাকে নবজাতক। একদিন সেই শিশুটি আধো গুলি ছেড়ে ‘মা’ উচ্চারণ করতে থাকে। মায়ের কাছ থেকে শেখা ভাষাতেই সে কথা বলতে শুরু করে। মা ও মাতৃভাষার এমন সেতুবন্ধন প্রতিটি মানুষেরই জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই মায়ের সংস্পর্শেই আলো-বাতাস, প্রকৃতি তথা চারপাশের সবকিছু সাথে গড়ে ওঠে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। যেহেতু জন্মের পর সে সর্বপ্রথম এই ভূমিকেই চিনতে পারে। এজন্য মা, মাতৃভাষার মতো মাতৃভূমিও তার জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
মমতাময়ী মা : কবি জসীমউদ্দীন বলেছেন –
‘দুঃখের সায়রে মায়ের এক সুখ
রঙিন ঝিনুকে পোরা মুক্তা এতটুকু।’
পৃথিবীতে যেকোনো মানুষের অতি আপনজন হলো তার মা। মায়ের স্নেহে ও আদর যত্নে বেড়ে ওঠে মানবশিশু। আর এই সন্তানকে গর্ভে ধারণ করা থেকে শুরু করে বড় করে গড়ে তুলতে জীবনভর মায়ের যে ত্যাগ শিকার করতে হয় তার ঋণ কোনোদিন শোধ হবার নয়। যেকোনো ধরনের বিপদের হাতছানি এলে মা তার সন্তানকে আগলে রাখেন। সন্তানের অমঙ্গলের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন থাকেন। রোগগ্রস্ত সন্তানের শয্যাপাশে মাকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। নিজের কথা ভুলে গিয়ে সন্তানের সুখের আশায় তার দিন কাটে। সন্তানের সুখের মধ্যেই মা তার সুখ খুঁজে পান। সন্তানকে একটু ভালো খাওয়াতে বা পরাতে পারলে মায়ের সুখের অন্ত থাকে না। অভাবের ঘরে যার বসবাস, সেই মা-ও নিজে না খেয়ে কষ্টার্জিত অন্ন তুলে দেন সন্তানের মুখে। শিক্ষা-দীক্ষায়, আচরণে সন্তান বড় হলে মাতৃত্বের সার্থকতায় মায়ের মন ভরে ওঠে। সন্তানের অস্তিত্বের মধ্যেই মিশে থাকে মায়ের অস্তিত্বের প্রমাণ। এই পৃথিবীতে সন্তানের কাছে মা তাই সর্বদা স্নেহময়ী, মঙ্গলময়ী ও মহিমাময়ী জননীরূপে বিরাজ করেন। মায়ের কাছে সবাই সমান। দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করে,দৈন্য ও তুচ্ছতাকে বরণ করে মা হন সর্বংসহা। মায়ের ভালোবাসায় আমাদের মধ্যে অন্য মানুষদেরকে ভালবাসতে শেখায়। তাই মা পরম প্রেমের-স্নেহের ও ভালোবাসার উৎস।
মাতৃভাষা : মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে প্রধানত যে ভাষা ব্যবহার করে, সেটা হলো মাতৃভাষা। মায়ের কাছে শেখা ভাষাতেই নিজস্ব পরিমন্ডলে মানুষ জ্ঞান, শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে। আমাদের শিক্ষাজীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন – ‘কোনো শিক্ষাকে স্থায়ী করিতে হইলে, গভীর করিতে হইলে, ব্যাপক করিতে হইলে তাহাকে চিরপরিচিত মাতৃভাষায় বিগলিত করিয়া দিতে হয়।’
মাতৃভাষা ও ইতিহাস অবলোকন : যেকোনো জাতির কাছে প্রিয় ভাষা হলো তাদের মাতৃভাষা। আর সেই মাতৃভাষার উপর যদি নিষেধাজ্ঞা আসে তাহলে তার মতো অপমান ও আঘাতের আর দ্বিতীয় উদাহরণ থাকতে পারে না। ঠিক এমনটিই ঘটেছিল ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা তথা মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্বেও এই বাংলাকে পরিত্যাগ করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জোরপূর্ব উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলার তথা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের তরুণ ছাত্রসমাজ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রাখতে বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়েছিল। সৃষ্টি হয় এর তাৎপর্যপূর্ণ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি।
মাতৃভাষা মর্যাদা ও স্বীকৃতি : ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর রক্ত ও শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাঙালীরা তাদের মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার যে ইতিহাস রচনা করেছিল তা বিশ্বে অনন্য। একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ভারতের আসাম প্রদেশের শিলচর স্টেশনে। সেখানে অসমিয়া ও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে ১১ জন শহীদ হয়েছিলেন। এই অনন্য ইতিহাস সরণ ও মাতৃভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের স্থাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট।
মা ও মাতৃভাষা : মা ও মাতৃভাষা পরস্পর অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। মায়ের কাছ থেকে শেখার মাধ্যমে এই ভাষাতেই সর্বোচ্চ সুন্দর ও সাবলীলভাবে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ মাতৃভাষাকে মাতৃস্তন্যের সাথে তুলনা করেছেন। আজন্ম যে ভালবাসার সাথে মানুষের পরিচয়, যে ভাষার মধ্য দিয়ে শিশু মাতাপিতা, আত্মীয় ও অন্যদের সাথে মনের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে, সেই ভাষায় তার সাথে,তার অস্থিমজ্জার সাথে মিশে যায়।
শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে মাতৃভাষা : অন্য ভাষায় শিক্ষা লাভ করা যেক্ষেত্রে কঠিন, সেক্ষেত্রে মাতৃভাষার মাধ্যমে অতি সহজেই শিক্ষালাভ ও জ্ঞানচর্চা সহজ, সাংস্কৃতিচর্চায়ও মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।
মাতৃভূমি : মাকে যেমন ভালোবাসা যায়, তেমনি মাতৃভূমি ও মায়ের মতো। মায়ের আদর-স্নেহে পালিত শিশুটি যে ভূমিতে দিন দিন বড় হতে থাকে, সেটাই তার মাতৃভূমি। আর মাতৃভূমির প্রতি ও তার অকৃত্রিম ভালবাসা জন্ম নেয়। কবি লর্ড বায়রন বলেছেন “মাতৃভূমিকে যে ভালবাসতে পারে না তার পক্ষে অন্য কিছুকে ভালোবাসা সম্ভব নয়।” অনেক কবি সাহিত্যিকই মাতৃভূমিকে স্বর্গের মহিমায় গৌরবান্বিত করেছেন। তাই বলা হয়, “জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপী গরীয়সী।”
মাতৃভূমি ও স্বাধীনতা : প্রত্যেক মানুষেরই মাতৃভূমি রয়েছে। আর সেই মাতৃভূমির সাথে রয়েছে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। কিন্তু মাতৃভূমিতে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। কেননা, মাতৃভূমি যদি পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি থাকে, তবে কারো জীবনই সুখকর হতে পারে না। তাই মাতৃভূমি স্বাধীনতা ও অত্যাবশ্যক।
মা, ও মাতৃভূমি : শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যেমন দিনে দিনে বেড়ে ওঠে, তেমনি পৃথিবীর আলো-বাতাস, তাপের সংস্পর্শে লালিত হয়। এই মাতৃভূমিকে মায়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কবি গোবিন্দদাসের কাব্যে এভাবেই ফুটে উঠেছে –
‘জননী গো জন্মভূমি তোমারে পবন
দিতেছে জীবন মোরে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে।
সুন্দর ও শশাঙ্কমুখ, উজ্জ্বল তপন,
হেরেছি প্রথমে আমি তোমারি আকাশে।’
মা মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি : মা থেকেই মাতৃভাষা, আর সেই মাতৃভাষার প্রতি হৃদয়ের গভীর আকুতি থেকেই মাতৃভূমির প্রতি মমত্ববোধ জেগে ওঠে। তাই মায়ের উপর আঘাত আসলে সন্তান যেমন চুপ থাকে না, তেমনি মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির উপর আঘাত নেমে আসলেও সন্তানেরা মৃত্যুঞ্জয়ী সংগ্রামী ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। ১৯৫২, ১৯৭১ সালগুলো সেই সংগ্রামেরই প্রতীক হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে মাতৃভাষার মর্যাদা যেমন রক্ষিত হয়েছিল, তেমনি ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পেয়েছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
বহমান শপথ : যেকোনো মানুষ তার মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকে ভালোবাসে। কিন্তু এমন কিছু ষড়যন্ত্রকারী থাকে, যারা মিথ্যা অভিনয় করে বরং মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির ক্ষতিসাধন করার চেষ্টা করে। এদের সম্পর্কে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন – “মাতা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি যারা অনুরাগহীন তারা পশু বিশেষ।” এরকম ষড়যন্ত্রকারী ও ভন্ড দেশপ্রেমিকদের হাত থেকে মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকে রক্ষা করার শপথ নিয়েই সবাইকে অগ্রসর হতে হবে। যেকোনো দেশের নাগরিকের জন্যই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য।
উপসংহার : মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি একই সূত্রে গাঁথা। ব্যক্তিজীবন তথা জাতীয় জীবনে এদের গুরুত্ব অপরিসীম, ঋণ অপরিশোধ্য। সেই ব্যক্তি সত্যিকারের মানুষ যার চিন্তাও কর্মে সর্বদা মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি রয়েছে অগাধ মামত্ববোধ। একজন সুনাগরিক ও সৎ মানুষ হিসেবে তাই প্রত্যেকেরই ব্রত হওয়া উচিত মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখা।