ভূমিকা : মানুষ হিসেবে বসবাস করতে গিয়ে যেসব মৌলিক অধিকার সমাজের স্বীকৃত হয়েছে, সেগুলোই মানবাধিকার। এটি একটি সামাজিক অঙ্গীকার। ব্যক্তি হিসেবে, সমাজের মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই রয়েছে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। বর্তমান বিশ্বজুড়ে নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়েই চলছে। তাই মানবাধিকার রক্ষায় আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।
মানবাধিকার কী : প্রথমত, মানুষ হিসেবে মানুষের অধিকারই হলো মানবাধিকার। জন্মসূত্রে পাওয়া এমন কিছু অধিকারকে মানবাধিকার বলা হয়, যা মানুষের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে এবং উদ্যম ও সৃজনশীলতাকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষের যেসব মানবিক গুণ রয়েছে, তার বিকাশের জন্য এবং সুস্থ-সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য যেসব অধিকার অপরিহার্য – সেগুলোই মানবাধিকার। দেশ-কাল নির্বিশেষে, জাতি, ভাষা বা ধর্মের কারণে পার্থক্য না করে সমাজের সকল মানুষের সমান অধিকার লাভের সুযোগ এবং সামাজিক পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে সকলের দায়িত্ব পালনের সমতাই হলো মানবাধিকার।
মানবাধিকারের পটভূমি : মানুষের বসবাসযোগ্য একটি নিরাপদ সমাজ অতীতকাল থেকেই প্রত্যাশিত ছিল। মানুষের অস্তিত্ব, মর্যাদা রক্ষা এবং বিকাশোপযোগী সমাজই সকলের দাবি। অতীতকাল থেকেই মানুষের এরকম অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর মধ্যে পৃথিবীর বুকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জানান দেয় যে মানুষের বেঁচে থাকার সার্বজনীন অধিকার ব্যতীত বিশ্বের কল্যাণ অনিশ্চয়তায় পর্যবসিত হবে। বিশ্বজুড়ে তখন বিষয়টি আলোড়ন তুলে দেশে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ অপেক্ষা মানুষের কল্যাণের চিন্তাই মুখ্য হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার সম্পর্কিত ধারণা বিস্তার লাভ করে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়। তখন থেকেই ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়।
মানবাধিকার ধারণার ক্রমবিকাশ : মানুষ এখন যতটা অধিকার সচেতন, পূর্বে এমনটি ছিল না। তাই অধিকার সম্পর্কিত ধারণা ও ছিল পুরাতন। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলের প্রজ্ঞা ও মনীষায় গ্রিক সভ্যতায় অধিকার সম্পর্কিত ধারণার উন্মেষ ঘটে। নগররাষ্ট্রের ধারণা অনুযায়ী বিধিসম্মতভাবে গঠিত আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের মধ্যে মানুষের যথার্থ স্বাধীনতা ও কল্যাণ নিহিত। এসব চিন্তা গ্রিসের রাষ্ট্রীয় জীবনে মানুষের অধিকার সচেতনতা বাড়িয়ে তুলেছিল।
বিভিন্ন ধর্মীয় শাস্ত্রেও মানুষের অধিকারের উল্লেখ আছে। কিন্তু ধর্মগ্রন্থগুলোতে মানবাধিকারের যে ধারণা পাওয়া যায়, তা সর্বজনীন ও শাশ্বত। আজকের দুনিয়ার সাথে তার পুরোটা কার্যকরী নাও থাকতে পারে। মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারের উন্নয়নে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সপ্তম শতকে বহুধর্মভিত্তিক সমাজের প্রেক্ষাপটে হযরত মুহাম্মদ (স.) কর্তৃক প্রণীত ‘মদিনা সনদ’ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
ইউরোপে মানবাধিকার ধারণার বিকাশ দ্রুতই ঘটতে থাকে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকারের কথা উচ্চারিত হয় প্রবলভাবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঐতিহাসিক দলিল হলো– ১২১৫ সালের ‘ম্যাগনাকার্টা’, ১৬২৮ সালের ‘পিটিশন অব রাইটস’, ১৬৮৮ সালের ‘বিল অব রাইটস’, ১৭০১ সালের ‘অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্ট’ ইত্যাদি। এই সনদগুলো ছাড়াও আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বাণী প্রভৃতি বিশ্বদরবারে মানবাধিকার অর্জন ও বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
মানবাধিকারের সর্বজনীন স্বীকৃতি : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা সারা দুনিয়ার মানুষকে ভাবিত করে। যুদ্ধে বিভীষিকা মানবিক অনুভূতিকে তীব্রভাবে আঘাত করে। তাই বিশ্বমানবতাকে রক্ষার জন্য ১৯২০ সালে গঠিত হয় ‘লীগ অব নেশনস’ বা ‘জাতিপুঞ্জ’। পরবর্তী সময়ে আরো একটি বিশ্বযুদ্ধের তান্ডব পৃথিবীব্যাপী মানবতার তীব্র হাহাকার ধ্বনি উচ্চারিত হয়। গড়ে ওঠে ‘জাতিসংঘ’। ১৯৪৫ সালের ২৫ জুন সারা বিশ্বের মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য সৃষ্টি করা হয় ‘মানবাধিকার সনদ’। পরবর্তীকালে ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘের ‘Economic and Social Council’ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত এ ঘোষণাই সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা বা ‘মানবাধিকার সনদ’ নামে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন মনীষীগণ এই সনদকে মানববিকাশের পথে একটি মায়েরফলক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। সর্বশেষে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা গ্রহণের মাধ্যমে মানবাধিকারের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিভূমি স্থাপিত হয়। তারপর থেকেই প্রতিটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার সমুন্নত রাখার প্রত্যয় নিয়ে জাতিসংঘ কাজ করে যাচ্ছে। মানবাধিকার সংরক্ষণ, কার্যকরকারণ, বাস্তবায়ন, বিকাশ ও উন্নয়নে যেকোনো রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের সচেষ্ট হতে হবে।
মানবাধিকার সনদের মূলকথা : জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত মানবাধিকার সনদে মানুষের যেসব মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা নিম্নরূপ –
১. জন্মগতভাবেই মানুষ সমমর্যাদার ও সম-অধিকার ভোগ করার অধিকারী।
২. জাতি-ধর্ম-বর্ণ এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষেরই বিয়ে ও পরিবার গঠনের, সম্পত্তি অর্জনের এবং সংঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার আছে।
৩. স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার, ভোট প্রদানের, চিন্তার ও বাকস্বাধীনতার অধিকার রয়েছে প্রতিটি মানুষেরই।
৪. প্রতিটি মানুষেরই সামাজিক নিরাপত্তা, বিশ্রাম ও বিনোদন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অধিকার রয়েছে।
৫. সমাজের বা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মানুষের রয়েছে কর্মের ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার।
৬. প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষেরই শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার আছে।
৭. একে অন্যের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করতে পারবে না।
৮. মানবাধিকার লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মানবাধিকার ও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি : মানবাধিকারের মূলেই রয়েছে মানুষ ও সমাজের কল্যাণ। জীবনের চাওয়া-পাওয়া, সুখ-সমৃদ্ধির সকল বিষয়েই একজন মানুষের থাকে। মানুষের সমাজ এখন আর আগের মতো নেই। মানুষের প্রয়োজন পূরণের সুযোগে প্রাপ্যতা ও অস্তিত্ব, সহজাত মর্যাদার সংরক্ষণ ও বিকাশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ও দায়বদ্ধতা মানবাধিকারকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ও কম নয়। দিন দিন দেশে দেশে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অনাহার, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি বাড়ছে। বেকারত্ব, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, আধিপত্য বিস্তার, অশিক্ষা ইত্যাদি বিশ্বকে অচল অবস্থা মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। পৃথিবী জুড়ে সম্প্রতি মানবপাচারের যে ঘটনা বিশ্ববিবেককে প্রতিনিয়ত আহত করছে, তা কিছুতেই সহ্য করার মতো নয়। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত মানুষের গণকবর খুঁজে পাওয়ার ঘটনায় প্রতিটি রাষ্ট্রের মানুষ আজ আতঙ্কগ্রস্থ। মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিভিন্ন দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর সশস্ত্র তৎপরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। হত্যার ঘটনা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মুনাফার স্বার্থে অসাধু অস্ত্র ব্যবসায়ীরা দেশের এসে যুদ্ধবিগ্রহ বাধানোর ষড়যন্ত্রে সর্বদালিপ্ত। আবার এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের জাতীয় সম্পদ দখলের জন্যও গোপনে ফন্দি আঁটে। এ সমস্ত তৎপরতা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। ফলে পৃথিবী আর শান্তিপূর্ণ থাকছে না। তাই পুনরায় প্রতিটি রাষ্ট্রকে সংঘবদ্ধ হয়ে পৃথিবীব্যাপী মানবাধিকারের ঝান্ডা ঊর্ধে তুলে ধরতে হবে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি : মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পেয়েছিল। সেই যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষকে নির্মমভাবে মেরে ফেলে ছিল, আড়ায় লক্ষ মা বোনের ইজ্জত কেড়ে নিয়েছিল, ৬২ হাজার গ্রাম লুটপাট করেছিল। নির্মম নির্যাতনে দেশ ছেড়ে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানিদের এই বর্বরতা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং তা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
বাংলাদেশের কিছু স্বার্থান্ধ গোষ্ঠী বিদেশের চাকরির সুযোগ প্রদানের লোভ দেখিয়ে অসহায় মানুষদেরকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই স্বার্থান্ধ গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক মানবপাচারের সাথে যুক্ত। মানুষ জীবনে নিরাপত্তা পাচ্ছে না। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর অপতৎপরতা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। স্বাধীন বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন হওয়ার কথা ছিল না। স্বার্থান্ধতার রাজনীতি, দলীয় সংকীর্ণতা, লুটপাট-দুর্নীতি প্রভৃতি বাংলাদেশকে এক অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এবং বাংলাদেশের মানুষের মানবাধিকার সমুন্নত রাখার জন্য বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং সচেতন জনগোষ্ঠীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।
উপসংহার : দুরাশার হাতছানি যতই থাকুক, পৃথিবীর বহু দেশেই এখন মানবাধিকার রক্ষার জন্য গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন, সমিতি ইত্যাদি। বাংলাদেশের ‘মানবাধিকার কমিশন’ দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট আছে। মানবাধিকার কর্মীরাও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জনসচেতনতা ও অধিকারবোধ জাগ্রত করছে। আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের মধ্যে ভ্রাতিত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ আরো সহজ হবে। একই পৃথিবীর অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি দেশ যদি মানুষের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়প্রত্যয়ে সংবদ্ধ হয়, তবে পৃথিবী হবে অবারিত সুখের আশ্রয়স্থল।