ভূমিকা : রাষ্ট্রের স্থায়ী অধিবাসী হলো নাগরিক। নাগরিক ব্যতীত রাষ্ট্রের গঠন কার্যত অচল। নাগরিক তার নাগরিকত্বের দাবিতে রাষ্ট্র থেকে কতিপয় অধিকার ভোগ করে এবং কর্তব্য পালন করে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের জন্য নাগরিক কাম্য, তবে সুনাগরিক অধিকতর কাম্য। কারণ সুনাগরিক রাষ্ট্রের সম্পদ। একমাত্র সুনাগরিকই পারে রাষ্ট্রের জন্য সমগ্র কিছু ত্যাগ করে রাষ্ট্রের কল্যাণ নিশ্চিত করতে। তাই সকলের উচিত রাষ্ট্রের স্বার্থে সুনাগরিক হওয়ার চেষ্টা করা।
নাগরিক কী : আজ থেকে আড়াই হাজার আগে প্রাচীন গ্রিসে নাগরিক ধারণার উদ্ভব ঘটে। তখনকার সময় প্রাচীন গ্রিসে রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। এগুলোকে বলা হতো নগর রাষ্ট্র। এসব নগর রাষ্ট্রের যারা প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণ করত,তাদেরকে মূলত নাগরিক বলা হতো। তাদের ভোটদানের অধিকার ছিল। কিন্তু তখনকার সময় নগর রাষ্ট্রে নারী, দাস-দাসী তথা বিদেশীরা নাগরিক হিসেবে গণ্য হতো না। সময়ের পরিবর্তনে বর্তমান এরূপ ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আমরা নাগরিক বলতে বুঝি যারা রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং রাষ্ট্র প্রদত্ত সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে।
সুনাগরিক কী : রাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা সকলেই নাগরিক। কিন্তু সুনাগরিক সবাই হতে পারে না। সুনাগরিকের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। মূলত সুনাগরিক তারাই যারা বুদ্ধিমান, সকল সমস্যার সমাধান খুব সহজেই করতে পারে, যারা বিবেক দ্বারা অন্যায় অত্যাচার বুঝতে পেরে অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখে, আত্মসংযম দ্বারা নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থকে ত্যাগ করে জাতির কল্যাণের দিকে মনোযোগ দেয়, তারাই সুনাগরিক, সুনাগরিক রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের উচিত সুনাগরিকের প্রতি যত্নশীল হওয়া।
নাগরিক ও সুনাগরিক এর মধ্যে পার্থক্য : নাগরিক হলো রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান। নাগরিক রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং রাষ্ট্র প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে ও তার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে। নাগরিক ব্যতীত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনাতীত। এদিক বিবেচনা করলে রাষ্ট্র গঠনে অবশ্যই নাগরিকের প্রয়োজন রয়েছে। আর সুনাগরিক রাষ্ট্রের এক মহামূল্যবান সম্পদ। নাগরিক ও সুনাগরিক এক নয়। এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সুনাগরিক বলতে বোঝায় যারা বুদ্ধি,বিবেক ও আত্মসংমের অধিকারী। যার দ্বারা ন্যায়-অন্যায় বিবেচনাপূর্বক রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখে।
সুনাগরিক হওয়ার পূর্বশর্ত : নাগরিকত্ব অর্জন করা খুব সহজ। কিন্তু সুনাগরিক হওয়া বড়ই কঠিন। এক্ষেত্রে অবশ্যই সুনাগরিককে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধারণা করতে হয়। নিম্নে সুনাগরিকতা অর্জনের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো –
১.বুদ্ধি : সুনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্ত হলো বুদ্ধি। সুনাগরিককে অবশ্যই বুদ্ধিমান হতে হবে, যা দ্বারা তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সফল করতে হলে সুনাগরিকের বুদ্ধি বা পরামর্শ শক্তিশালী মাধ্যম। এজন্য প্রতিটি রাষ্ট্রের উচিত সাধারণ নাগরিককে সুনাগরীকে পরিণত করার জন্য সুশিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
২.বিবেক : প্রতিটি মানুষের বিবেকবান হওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে সুনাগরিকতা অর্জনের জন্য বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সুনাগরিক তার বিবেক দ্বারা ন্যায়-অন্যায়কে পৃথক করে অন্যায় কাজ হতে নিজেকে দূরে রাখতে পারে। যা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। বিবেক দ্বারা সুনাগরিক রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দেশপ্রেম, কর প্রদানসহ,বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্য সম্পাদন করে থাকে।
৩.আত্মসংযম : আত্মসংযম সুনাগরিকের একটি বিশেষ গুণ। এটি দ্বারা তিনি নিজের লোভ-লালসা কে সংযত করে নৈতিকতাবোধ ও মানবতাবোধ অর্জন করতে পারে না। সুনাগরিক আত্ম-সংযমী হলে তার মাঝে সজন প্রীতি বা পক্ষপাতি মনোভাব থাকে না, যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে গতিশীল করে তোলে।
সুনাগরিকের করণীয় : সুনাগরিক রাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদ কেননা রাষ্ট্রের কল্যাণে সুনাগরীক বহু কাজ করে থাকে ; যারা রাষ্ট্রের বিকাশ ও উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সুনাগরিকের রাষ্ট্রের জন্য করণীয় অনেক। নিচে এগুলো বর্ণনা করা হলো –
১.রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন : প্রতিটি নাগরিকের উচিত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। কেননা নাগরিক যদি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত না থাকে, তাহলে রাষ্ট্র কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হয়। ক্রমাগত ব্যর্থতায় পরিণত হয়। তাই প্রত্যেক নাগরিকের উচিত রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালনসহ আনুগত্য প্রদর্শনে সচেতন হওয়া।
২.আইনের প্রতি শ্রদ্ধা : আইন হলো কতগুলো নিয়ম-নীতি। যা দ্বারা রাষ্ট্রের ন্যায়-অন্যায়মূলক কর্মকান্ড খুব সহজে চিহ্নিত করা যায়। নাগরিক যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তবে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলাবোধ, হানাহানি-মারামারি বা আইনবিরোধী এবং রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণ বয়ে আনতে পারে এমন কোনো কার্য সংঘটিত হয় না। এতে সহজে রাষ্ট্রের শান্তির-শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হয়।
৩.রাজনৈতিক কর্তব্য : রাজনৈতিক হলো রাষ্ট্রের প্রাণস্বরূপ। রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কিংবা সর্বোচ্চ ক্ষমতা গ্রহণ করে। কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। আর তাদেরকে ভোট প্রদানের মাধ্যমে নাগরিক রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ করে দেয়। কেবল সুনাগরিকই পারে ভোট প্রদানের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে।
৪.কর প্রদান : রাষ্ট্র পরিচালিত হয় জনগণের অর্থায়নে। জনগণ তার সম্পদের উপর রাষ্ট্র আরোপিত কর নির্দিষ্ট সময়ে প্রদান করে এবং তা জমা হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে। পরবর্তীতে এ অর্থ রাষ্ট্রের পরিচালনা ও উন্নয়ন ভার বহন করে। আর সুনাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব হলো নিয়মিত রাষ্ট্রের কর পরিশোধপূর্বক অন্যকে তা পরিশোধে উৎসাহিত করা।
৫.স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সচেতন থাকা : রাষ্ট্রের চরম ও চূড়ান্ত শক্তি হলো স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। এগুলো ব্যতীত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনাতীত। এজন্য সুনাগরিকের উচিত রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারপূর্ব রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবনবাজি রাখা।
৬.দেশপ্রেম : দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। দেশের প্রতি ভালোবাসা বা মমত্বই দেশপ্রেম। সুনাগরিক যদি দেশপ্রেমিক হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সফলতার পথ সুগম হয়। তাই রাষ্ট্রের কল্যাণে সুনাগরিক অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সুনাগরিকই পারে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রের জন্য নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থকে ত্যাগ করে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ পূরণে নিজেকে নিয়োজিত করতে এবং সর্বাত্মক ত্যাগ স্বীকার করতে।
৭. সাম্যবাদী চেতনা : সাম্য অর্থ হলো সমান। কিছু নাগরিককে অবশ্যই সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। কেননা সাম্যবাদী চেতনার দ্বারা রাষ্ট্রের ধনী-গরিব, জাতি, ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার রক্ষা করা নিশ্চিত হয়। যা এক দিকে যেমন রাষ্ট্রের সকলে সকলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তেমনি শৃঙ্খলাও রক্ষা পায়।
৮.মানবিকতা অর্জন : মানবতাবোধ মানুষের একটি বিশেষ গুণ যা মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের থাকা উচিত। এতে সমাজের শান্তি সোহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা পায়। তাই সুনাগরিক হতে এই গুণটি অর্জন করতে হবে। এই গুনটি দ্বারা সমাজের গরীব-অসহায়, দুর্বল মানুষের উপর মমত্ব বজায় থাকে। যার ফলে তারাও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে অধিকার ভোগ ও স্বাধীনভাবে চলাচল করার সুযোগ পাই এবং কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের বৈষম্য দূর হয়।
৯.সুশিক্ষা অর্জন : শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা মানুষের সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত করতে সহায়তা করে, যা দ্বারা মানুষ বুদ্ধি-বিবেক, আত্মসংযম ইত্যাদি অর্জন করে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। তাই সুনাগরিককে অবশ্যই সুশিক্ষা গ্রহণ করে উক্ত গুণগুলো অর্জন করতে হবে। এতে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে সুখী ও সুন্দর করা সহজ হয়ে। এজন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই সুশিক্ষা বিস্তার করে সুনাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে।
১০.চরিত্রবান হওয়া : চরিত্র মানুষের মহৎ গুণ। চরিত্রকে মানুষের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। চরিত্রবান মানুষ সহজেই বিবেকবান ও আত্মসংযমী হতে পারে। এতে সমাজ নিয়ম-শৃংখলার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এজন্য সচ্চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। এর মাধ্যমে ন্যায় অন্যায় বিচারপূর্বক রাষ্ট্রীয় প্রত্যেকটি নাগরিকের মাঝে আত্মিক বন্ধন নিশ্চিত করতে হবে।
সুনাগরিকের প্রয়োজনীয়তা : প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য যেমন নাগরিক অপরিহার্য উপাদান, তেমনি সুনাগরিকও। নাগরিক তার নাগরিক দায়িত্ব-কর্তব্য পালনসহ রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকার ভোগ করে। কিন্তু সুনাগরিক আরো বেশি সচেতন। মূলত তারা রাষ্ট্রের অভিভাবকস্বরূপ। তারা তাদের মেধা-শ্রম দ্বারা সর্বদা রাষ্ট্রের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সচেষ্টা থাকে। একটি রাষ্ট্রকে সব ক্ষেত্রে সফল করতে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় তাদের গঠনমূলক সমালোচনায় সরকার রাষ্ট্রের স্বার্থ বিরোধী কাজে অগ্রবর্তী হতে পারে না। এতে ব্যক্তিস্বার্থ অপেক্ষা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ মজবুত হয়। নাগরিক তার মৌলিক অধিকার ভোগ ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ পায়। সরকারের সেচ্ছাচারিতা দূর করে দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীয় মতো কাজ করে তারা। তাছাড়া রাষ্ট্রকে আধুনিকায়ন করার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা অশেষ। তাই বলা যায়, রাষ্ট্রকে সফল ও সার্থক করার ক্ষেত্রে সুনাগরিকের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার : সুনাগরিক রাষ্ট্রের মহামূল্যবান সম্পদ। তারা সুশিক্ষা অর্জন করে বুদ্ধিমান বিবেকবান হতে পারে। এতে রাষ্ট্রের সংহতি ও সোহার্দ রক্ষা পায়। তাই রাষ্ট্রের উচিত সুনাগরিক গড়ে তোলায় সচেতন হওয়া। এতে রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন ও স্বার্থরক্ষা দু-ই করা সম্ভব হবে।
আমি সুনাগরিক হতে চাই রচনা PDF Format
অন্যান্য রচনা
প্রতিভা রচনা
যৌন নিপীড়ন : এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা