অথবা, আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব
অথবা, একজন আদর্শ ব্যক্তি
ভূমিকা : প্রত্যেকেই সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে আহরণ করতে পারে কোন না কোন আদর্শ ব্যক্তিকে অনুসরণের মধ্য দিয়ে। একজন ছাত্রের সবচেয়ে বেশি সান্নিধ্য লাভের সুযোগ ঘটে একজন শিক্ষকের সাথে। এ কারণেই অজ্ঞাতসারেই তার মনে আসন করে নেয় কোন না কোন প্রিয় শিক্ষক। সন্তানস্নেহে একজন শিক্ষক যখন কোন ছাত্রকে শেখান তখন পরস্পরের মধ্যে গড়ে ওঠে এক মধুর সম্পর্ক। একজন ছাত্র হিসেবে আমার সবচেয়ে পছন্দের যে মানুষটি তিনি হলেন অধ্যক্ষ আব্দুল মজিদ স্যার। হোমনা উপজেলার জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তিনি শুধু আমার প্রিয় শিক্ষকই নন বরং আমার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক অনুপম পদপ্রদর্শক।
প্রথম পরিচয় : অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর আমি আমার বাবার সাথে একবার হোমনা যায়। সেখানে আমার মামার বাসা। ফেরার সময় হঠাৎ স্যারের সাথে দেখা। আমার বাবা আমাকে স্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আমি অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছি একথা শুনেই স্যার আমাকে প্রবল ভাবে অনুপ্রাণিত করলেন। তার কথাগুলো আমাকে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় আকৃষ্ট করল। আমাকে তিনি তার স্কুলে ভর্তি হবার কথা বললেন।
স্কুলে ভর্তি : দুর্ভাগ্যবশত আমার বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। এই হতাশা আমাকে গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে। এরই মাঝে হঠাৎ করে একদিন মামার চিঠি আমার হাতে আসে। মজিদ স্যার নাকি আমার খোঁজ নিয়েছেন এবং স্যার খুব দ্রুত তার সাথে দেখা করতে বলেছেন। পত্র পাবার পরদিনই আমি হোমনাতে আমার মামা বাড়িতে চলে গেলাম। মামার বাসার পাশে স্যারের স্কুলটি। মামা আমাকে স্যারের নিকট নিয়ে গেলেন। আমাকে দেখে স্যার অত্যন্ত স্নেহমাখা চোখে আমার দিকে তাকালেন এবং আমাকে বসতে বললেন। মুহূর্তের মধ্যেই স্যারের প্রেরণাদীপ্ত কথা আমাকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে তুলল। তার কথায় আমি যেন প্রাণহীন বুকে প্রাণ ফিরে পেলাম। আমার নিরাশ প্রাণে তিনি জ্বালিয়ে দিলেন আশার আলো। হতাশার কালোমেঘ যেন আমার অন্তর থেকে চির তিরোহিত হলো। মনে হলো এ পাওয়া যেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া।
অবদানের ব্যাপকতা : দরিদ্র এবং দুর্বল ছাত্রদের নিয়ে যিনি জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে তাদেরকে পৌঁছে দিচ্ছেন সাফল্যের শীর্ষে – তার এ একটি অবদানের পরিসীমা টানলেই তা ব্যাপকতার দিক দিয়ে হবে সুদূরপ্রসারী। একজন ছাত্রকে ভর্তি করানোর পর থেকেই তার মেধাকে শানিত না করা পর্যন্ত তিনি যেন স্বস্তি পান না। এমনিতেই এই স্কুলটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী স্কুল। নিভৃত পল্লীতে এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত। ছাত্রদেরকে বাধ্যতামূলকভাবেই ছাত্রবাসে থাকতে হয়। প্রতিটি ছাত্রাবাসে রয়েছে সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান। প্রতিটি ছাত্রবাসের দায়িত্বে রয়েছে এক একজন করে শিক্ষক। স্কুলে পাঠদান পদ্ধতি ও ভিন্নধর্মী। ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবককে তাদের ফলাফল অবগত করানোর জন্য এখানে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। একারণে ছাত্র-ছাত্রীদের কোথাও ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু স্যার নিজেই এই স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা এবং কর্ণধার তাই শিক্ষার ক্ষেত্রে এরূপ পদ্ধতির প্রচলন একান্তই তাঁর। তাঁর এ পদ্ধতি শিক্ষাক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। স্যার শুধু এখানেই তার অবদান সীমিত রাখেননি। তিনি হোমনাতে একটি মহিলা কলেজ ও প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন ছাত্রের জন্য ‘সহায়ক পুস্তক’ ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে তিনি ‘পপি লাইব্রেরী’ নামে গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা। তাছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে নিয়মিত সেবামূলক কাজ করে চলেছেন।
আদর্শ ব্যক্তিত্ব : তিনি শুধু আমাদের প্রিয় শিক্ষকই নন তিনি আমাদের একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। তাঁর ব্যক্তিত্বে শুধু আমি মুগ্ধ নই,আমার সহপাঠিরা সকলেই তার আদর্শকে অনুসরণ করে চলে। একজন অধ্যক্ষ হিসেবে সাধারণত ছাত্রদের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে দূরত্ব না রেখে তিনি সকল ছাত্রের সাথেই আপনজনের ন্যায় মেশেন। বিভিন্ন রসিকতার মধ্য দিয়ে তিনি ছাত্রদের খুব আন্তরিক করে তোলেন। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সাধারণ। বর্তমানে বিলাসিতার যুগে স্যারকে দেখলে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কথা মনে পড়ে। তাঁর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে শুধু ছাত্ররাই নয় আশেপাশের প্রতিটি মানুষই যেন পরম মুগ্ধ।
অনুভূতিপ্রবণতা : স্যারের অনুভূতি প্রবণতা আমাকে চরমভাবে মুগ্ধ করে। আমার আর্থিক দিকটা স্যার জানতেন। তাই এস.এস.সি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় তাঁর কাছে যায়। তিনি আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমাকে দেখে আমার সমস্যা বুঝতে পারলেন। তিনি নিজ থেকে আমাকে ফরম পূরণের জন্য নূন্যতম টাকা পরিশোধ করতে বললেন। যেকোনো সমস্যা নিয়ে গেলে তিনি যেন আগে থেকেই সব বুঝতে পারতেন এবং সমাধানের নির্দেশনা দিতেন। তার অনুভূতি প্রবণতার গুনেই তিনি প্রতিটি ছাত্র, শিক্ষক এবং প্রতিবেশীদের প্রিয় মানুষে পরিণত হয়েছেন।
উপসংহার : একজন শিক্ষক যে কিভাবে একটি হতাশাগ্রস্ত, নির্জীব প্রাণে নব প্রেরণার সৃষ্টি করতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অধ্যক্ষ আব্দুল মজিদ স্যার। আজ প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে যদি তার মত শিক্ষক থাকতেন, তাহলে দেশের শিক্ষার ভাবমূর্তিই পাল্টে যেত। সকল কালিমা দূরীভূত হয়ে শিক্ষার ক্ষেত্র সূচিত হতো এক নতুন যুগের।